ইতিহাস ও ভূরাজনীতি: দুর্গম পাহাড় থেকে লোহিত সাগরের ত্রাস: কারা এই ‘হুথি’ গোষ্ঠী?.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইতিহাস ও ভূরাজনীতি: দুর্গম পাহাড় থেকে লোহিত সাগরের ত্রাস: কারা এই ‘হুথি’ গোষ্ঠী?..

আই নিউজ বিডি ডেস্ক  avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
ইতিহাস ও ভূরাজনীতি: দুর্গম পাহাড় থেকে লোহিত সাগরের ত্রাস: কারা এই ‘হুথি’ গোষ্ঠী?..
ইতিহাস ও ভূরাজনীতি: দুর্গম পাহাড় থেকে লোহিত সাগরের ত্রাস: কারা এই ‘হুথি’ গোষ্ঠী?..
ছবি: সংগৃহীত
বর্তমান বিশ্বরাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত প্রেক্ষাপটে যে নামটি বারবার সংবাদের শিরোনামে উঠে আসে, তা হলো ইয়েমেনের ‘হুথি’ (Houthi) গোষ্ঠী। লোহিত সাগরে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা কিংবা বিশ্বশক্ত..

হুথি আন্দোলনের জন্ম ও ইতিহাস

হুথি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে, ইয়েমেনের উত্তরের প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চল সা’দা (Saada)-তে। এই আন্দোলনের মূল রূপকার ছিলেন হুসাইন বদরুদ্দিন আল-হুথি। তাঁর নামানুসারেই পরবর্তীকালে এই আন্দোলনের নাম হয় ‘হুথি’।

হুথিরা মূলত শিয়া ইসলামের একটি শাখা ‘জাইদি’ (Zaidism) মতাদর্শের অনুসারী। ইয়েমেনে শতাব্দী ধরে জাইদিদের শাসন থাকলেও ১৯৬২ সালের বিপ্লবের পর তারা রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। একই সময়ে ইয়েমেনে সালাফি ও ওয়াহাবি মতাদর্শের বিস্তার ঘটতে থাকলে, নিজেদের হাজার বছরের পুরোনো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদে তারা ‘আনসারুল্লাহ’ (আল্লাহর সাহায্যকারী) নামে সংগঠিত হতে শুরু করে।

সরকারি নিপীড়ন থেকে সশস্ত্র আন্দোলন

শুরুতে এটি একটি ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারমূলক আন্দোলন থাকলেও ২০০৪ সালে ইয়েমেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের সঙ্গে হুথিদের সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। সরকারের দমন-পীড়নে একই বছরে আন্দোলনপ্রধান হুসাইন আল-হুথি নিহত হন। কিন্তু এতে আন্দোলন দমে যাওয়ার বদলে তাঁর ভাই আব্দুল মালিক আল-হুথি-র নেতৃত্বে এটি আরও শক্তিশালী ও সুসংগঠিত সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। ২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে হুথিরা ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে ছয়টি বড় ধরনের যুদ্ধে জয়ী বা সমকক্ষ অবস্থান বজায় রাখে।

সানা দখল ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উত্থান

২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’-এর উত্তাল তরঙ্গে ইয়েমেনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। প্রেসিডেন্ট সালেহর পতনের পর দেশজুড়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক শূন্যতার পূর্ণ সুযোগ নেয় হুথিরা। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তারা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ইয়েমেনের রাজধানী সানা (Sanaa) দখল করে নেয় এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্দ রব্বু মনসুর হাদিকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

এর পর ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা ও যুদ্ধ শুরু করলেও, হুথিদের পরাস্ত করতে ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ যুদ্ধের পর ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমের মূল জনবহুল অঞ্চল এবং রাজধানী হুথিদের অখণ্ড নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

আঞ্চলিক প্রভাব ও লোহিত সাগরের ভূরাজনীতি

বর্তমানে হুথি কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ কোনো বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়; তারা মধ্যপ্রাচ্যের তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ (Resistance Axis)-এর অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ইরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি ড্রোন ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে।

ফিলিস্তিনের গাজা সংঘাত কেন্দ্র করে লোহিত সাগরে ইয়েমেন উপকূলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে তাদের টানা ড্রোন ও মিসাইল হামলা পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও শিপিং রুটকে অচল করে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর সামরিক উপস্থিতি সত্ত্বেও লোহিত সাগরে হুথিদের অবস্থান প্রতিরোধ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে।

শেষ কথা

একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষার আঞ্চলিক আন্দোলন থেকে হুথিরা আজ বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপথ নির্ধারণকারী শক্তিতে রূপ নিয়েছে। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ইতিহাস আর তাদের এই অভাবনীয় উত্থান প্রমাণ করে—ভূরাজনীতিতে নীতি, কৌশল ও ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম

Nema komentara


News Card Generator