নির্বাসিত জীবনে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা: রাষ্ট্রীয় চাপ, বিচার বিভাগীয় সংকট ও এক অনিশ্চিত গন্তব্য.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নির্বাসিত জীবনে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা: রাষ্ট্রীয় চাপ, বিচার বিভাগীয় সংকট ও এক অনিশ্চিত গন্তব্য..

আই নিউজ বিডি ডেস্ক  avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
নির্বাসিত জীবনে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা: রাষ্ট্রীয় চাপ, বিচার বিভাগীয় সংকট ও এক অনিশ্চিত গন্তব্য..
নির্বাসিত জীবনে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা: রাষ্ট্রীয় চাপ, বিচার বিভাগীয় সংকট ও এক অনিশ্চিত গন্তব্য..
ছবি: সংগৃহীত
সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ২০১৭ সালে দেশত্যাগের পর দীর্ঘ ৯ বছর ধরে কানাডায় রিফিউজি হিসেবে জীবনযাপন করছেন। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের জের ধরে তৎকালীন সরকারের চাপে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া ..

২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর রাতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক চরম রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় অস্থিরতার মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। অস্ট্রেলিয়া হয়ে বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে বসবাসরত সাবেক এই প্রধান বিচারপতি দীর্ঘ ৯ বছর ধরে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। নিজের বর্তমান অবস্থাকে তিনি রিফিউজি বা ভাসমান হিসেবে অভিহিত করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় দেওয়ার পর থেকেই তিনি সরকারের রোষানলে পড়েন। তার ভাষ্যমতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে সরকারের পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য সরাসরি চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। এই রায় নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যা দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অভিযোগ, তাকে পরিকল্পিতভাবে একটি সাজানো মামলায় জড়িয়ে দেশছাড়া করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কানাডায় স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করলেও তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে দায়ের করা মামলার কারণে কোনো পুলিশ রিপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট পাচ্ছেন না। তার দাবি, উত্তরাস্থ নিজের সম্পদ বিক্রি করে অ্যাপার্টমেন্ট কেনা সংক্রান্ত বিষয়কে জালিয়াতি হিসেবে উপস্থাপন করে দুদক যে মামলা করেছে, তা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি জানান, তার স্ত্রী কানাডায় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেলেও তিনি নিজে স্ট্যাটাসবিহীন অবস্থায় রয়েছেন। এই দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তিনি একদিকে যেমন একাকীত্বের শিকার, অন্যদিকে নিজের সম্মান ও অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য লড়াই করছেন। তার মতে, একজন প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি হিসেবে জয়েন্ট সেক্রেটারি পর্যায়ের কর্মকর্তার কাছে গিয়ে স্বাক্ষর সত্যায়িত করাটা কেবল অপমানজনকই নয়, বরং এটি তার ওপর করা রাষ্ট্রীয় অবিচারের একটি অংশ।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের পেছনে অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধিমালা এবং ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সরকারের সাথে তার মতপার্থক্য মূল ভূমিকা পালন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে তখন বারবার দাবি করা হয়েছিল যে তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে ছুটিতে রয়েছেন, কিন্তু পরবর্তীতে তার দেশত্যাগ এবং সরকারের কড়া সমালোচনা প্রমাণ করে যে বিষয়টি ছিল মূলত বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের ফল। এমনকি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তিনি দেশে ফেরার জন্য পাসপোর্টের আবেদন জানালেও কানাডায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনসাল জেনারেল কার্যালয় থেকে কোনো সাড়া পাচ্ছেন না বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার পেনশনের পাওনা অর্থ প্রদান ও পাসপোর্ট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে যে জটিলতা তৈরি করা হয়েছে, তা মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সুরেন্দ্র কুমার সিনহার এই করুণ পরিণতি বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং উচ্চ আদালতের বিচারকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তার নির্বাসন কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি দেশের বিচারিক ব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি স্পষ্ট দলিল। ভবিষ্যতে যদি কোনো বিচারককে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তবে তা দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেবে। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির বর্তমান এই অসহায় অবস্থা এবং পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘোরার ঘটনা প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কীভাবে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ মর্যাদাকে ধূলিসাৎ করতে পারে। তার এই আইনি লড়াইয়ের শেষ পরিণতি কী হবে এবং রাষ্ট্র তাকে তার প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেবে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator