নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পাওনা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন। ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত পাঁচ বছরের আয়করের বিপরীতে এনবিআরের এই বিশাল অঙ্কের দাবিকে আইনত বৈধ বলে গণ্য করেছেন আদালত। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিকে আগামী তিন অর্থবছরের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ বকেয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই রায় প্রকাশের ফলে গ্রামীণ কল্যাণের ওপর কর পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা চূড়ান্ত রূপ পেল, যা দেশের কর ব্যবস্থাপনা ও করদাতাদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মূলত ২০১৭ সালে এনবিআর কর্তৃক উত্থাপিত কর দাবির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে গ্রামীণ কল্যাণ হাইকোর্টে দুটি পৃথক রিট আবেদন দায়ের করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ের পর গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠানটির রিট আবেদনগুলো খারিজ করে দিলে এনবিআরের দাবি আদায়ের পথ প্রশস্ত হয়। ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীদের অভিযোগ ছিল যে, এনবিআরের কর নির্ধারণী প্রক্রিয়া যথাযথ আইনি মানদণ্ড অনুসরণ করেনি। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, কর আইন অনুযায়ী এনবিআরের এই দাবি যৌক্তিক এবং তা পরিশোধের কোনো বিকল্প নেই। রিট খারিজের ফলে প্রতিষ্ঠানটির সামনে এখন আর কোনো আইনি সুরক্ষা কবচ অবশিষ্ট নেই, যার ফলে কর ফাঁকির বা কর পরিশোধে গড়িমসির সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
এই রায়ের বিপরীতে গ্রামীণ কল্যাণের আইনি প্রতিনিধি খাজা তানভীর জানিয়েছেন, এনবিআরের কর দাবির বিরুদ্ধে তারা আদালতে আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন, কিন্তু আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কর দাবি বহাল রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এনবিআর বা সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বাড়তি মন্তব্য না পাওয়া গেলেও সরকারি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই রায়কে বড় বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালের ৪ অক্টোবর এই সংক্রান্ত একটি রায় স্বতঃপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে পুনরায় নতুন বেঞ্চে পাঠানোর ঘটনাটি আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে চূড়ান্ত শুনানিতে কর আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে আদালত এনবিআরের অবস্থানকে সুসংহত করেছে, যা কর ফাঁকির প্রবণতা রোধে একটি কঠোর বার্তা প্রদান করছে।
হাইকোর্টের এই রায় কেবল গ্রামীণ কল্যাণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও এটি দেশের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সময়মতো এবং যথাযথ কর প্রদান যে আইনত অপরিহার্য, এই রায়ের মাধ্যমে তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হলো। ৬৬৬ কোটি টাকার এই বিশাল অংক জাতীয় রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে, কর সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে এবং করদাতা প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশের বিচার ব্যবস্থা যে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ করেছে, তা আগামী দিনে কর রাজস্ব সংক্রান্ত মামলাগুলোর নিষ্পত্তিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।