ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আয়োজিত অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ১২ জন সাংবাদিক পুলিশের হাতে আটকের শিকার হয়েছেন। গত রোববার আরকে আশ্রম মার্গ ও কনট প্লেস এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দিল্লি পুলিশ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সংবাদকর্মীদের ওপর চড়াও হয় এবং কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়াই তাদের জোরপূর্বক আটক করে বাসে তোলে। আটককৃতদের মধ্যে হিন্দুস্তান, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দি এবং দ্য হিন্দুসহ একাধিক জাতীয় ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপের বহিঃপ্রকাশ।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত অমানবিক আচরণ করেছেন এবং সাংবাদিকদের পেশাগত পরিচয়কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন। হিন্দুস্তানের প্রতিবেদক আশিস সিং জানিয়েছেন, ঘটনাস্থলে নিজের পরিচয়পত্র প্রদর্শন করা সত্ত্বেও পুলিশ সদস্যরা তাকে ধাক্কাধাক্কি করেন এবং আঙুলে পরা ধাতব বস্তু দিয়ে আঘাত করেন। একইভাবে, কনট প্লেস এলাকায় কর্তব্যরত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তিন প্রতিবেদক শাশ্বত, সিয়া ও বিজয়কে আটক করে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আলোকচিত্রী অভিযোগ করেছেন যে, পুলিশ তাদের ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং সংগৃহীত ফুটেজ মুছে ফেলার ভয় দেখিয়ে মেমোরি কার্ড লুকিয়ে রাখতে বাধ্য করেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে এই ধরনের বলপ্রয়োগ ও হয়রানি সাংবাদিকদের মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা দুঃখপ্রকাশ করা হয়নি। পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের আটকের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যা এই ঘটনার দায়বদ্ধতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যদিও পরবর্তীতে কিছু সাংবাদিককে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অগণতান্ত্রিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দ্য হিন্দু’র এক নারী প্রতিবেদক নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রতিবাদ জানালে তাকে সাময়িকভাবে আটকের পর ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশের এই বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে সংবাদকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যেন সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি তোলা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের এই কর্মকাণ্ড ভারতের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিক্ষোভের তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো সাংবাদিকদের দায়িত্ব, কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে এমন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি জনস্বার্থের পরিপন্থী। এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতে থাকলে সংবাদকর্মীরা তাদের দায়িত্ব পালনে ভীতি অনুভব করবেন, যা শেষ পর্যন্ত একটি দেশের মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বচ্ছতার ধারণাকে খর্ব করবে। প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এহেন আচরণ কেবল সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত অধিকারই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং তা নাগরিকের তথ্যের অধিকারকেও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিচারিক ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।