সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সম্প্রতি সংঘটিত এক ভয়াবহ হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় আরও চারজন বাংলাদেশি গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, যাদের বর্তমানে রিয়াদের একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। হামলার পরপরই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা বিবেচনায় ফ্লাইট চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেছে। হামলার ধরন এবং এর নেপথ্যে কারা জড়িত, তা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা না হলেও, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই হামলাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে কূটনৈতিক মহল। নিহতদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং তাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এই ঘটনায় বাংলাদেশের কোনো ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য সরকারের হাতে নেই বলে জানা গেছে।
ভয়াবহ এই হামলায় ভুক্তভোগীদের পরিবারের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, একইসঙ্গে বিদেশের মাটিতে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। আহত চারজনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। তবে এই ধরনের হামলায় প্রবাসীদের প্রাণহানি নিয়মিত বিরতিতে ঘটছে, যা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিদের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তার বিষয়টি চরম অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় কর্মসংস্থানকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে আহতদের চিকিৎসা ব্যয় ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্ট মহল। রিয়াদের মতো একটি সুরক্ষিত এলাকায় এই ধরনের নিরাপত্তা ত্রুটি কীভাবে ঘটল, তা নিয়েও জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
ঘটনার পরপরই সৌদি আরবে বাংলাদেশ মিশন সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং সেখানে অবস্থানরত প্রবাসীদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সৌদি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে নিহতদের মরদেহ দেশে আনা এবং আহতদের চিকিৎসার বিষয়টি তদারকি করছে দূতাবাস। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে এ পর্যন্ত ১৪ জন বাংলাদেশিকে প্রাণ দিতে হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে এই ধরনের বিপর্যয় ও হামলা বন্ধ হবে। তবে কেবল কূটনৈতিক আশ্বাস নয়, বরং প্রবাসীদের কর্মক্ষেত্রে সরাসরি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কঠোর আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এই হামলার ঘটনা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের পেশাগত জীবনের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে রিয়াদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে হামলার ফলে শ্রমবাজারের অস্থিরতা ও প্রবাসীদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত বিমান চলাচল স্থগিত হওয়ার ফলে প্রবাসীদের যাতায়াত ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত ও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, প্রবাসীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালো ভূমিকা রাখা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বিদেশের মাটিতে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত এই প্রবাসী কর্মীরা ধারাবাহিকভাবে এমন অনিরাপদ পরিস্থিতির শিকার হতে থাকবেন, যা দেশের সামগ্রিক জনশক্তি রপ্তানি খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।