সরকার চাইলেই সম্ভব ; সদিচ্ছা, ভর্তুকি ও কঠোর মনিটরিংয়ে রাতারাতি দাম কমানোর উপায়.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সরকার চাইলেই সম্ভব ; সদিচ্ছা, ভর্তুকি ও কঠোর মনিটরিংয়ে রাতারাতি দাম কমানোর উপায়..

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
সরকার চাইলেই সম্ভব ; সদিচ্ছা, ভর্তুকি ও কঠোর মনিটরিংয়ে রাতারাতি দাম কমানোর উপায়..
সরকার চাইলেই সম্ভব ; সদিচ্ছা, ভর্তুকি ও কঠোর মনিটরিংয়ে রাতারাতি দাম কমানোর উপায়..
ছবি: সংগৃহীত
এটি কি কেবলই কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও বিপণন কাঠামোগত দুর্বলতা?..

 

বিশেষ অর্থনৈতিক ও বাজার পরিক্রমা প্রতিবেদন
  • সালাউদ্দিন আকবর  , ঢাকা 

সরকার যদি আন্তরিকভাবে চায়, তবে উপযুক্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত, সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কৌশল এবং কঠোর বাজার তদারকির মাধ্যমে রাতারাতি এলপিজির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন মূলত দুটি প্রধান হাতিয়ার:

ক) কৌশলগত ভর্তুকি ও ট্যাক্স পুনর্নির্ধারণ:

  • ভ্যাট ও শুল্ক প্রত্যাহার: বর্তমানে এলপিজি আমদানি, সিলিন্ডার তৈরি ও বিপণনের বিভিন্ন স্তরে যে ভ্যাট ও অগ্রিম কর (AIT) রয়েছে, সরকার তা সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ মওকুফ করতে পারে। আমদানির ওপর ট্যাক্স কমালে রাতারাতি সিলিন্ডার প্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দাম কমে যাবে।
  • ডলারের বিশেষ রেট: আমদানিকারকদের জন্য সাধারণ বাণিজ্যিক রেটের চেয়ে কম মূল্যে (বিশেষ কোটায়) সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে ডলার সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে এলসি বা ঋণপত্র খোলার খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমে আসবে।
  • টার্গেটেড সাবসিডি: নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ডিজিটাল রেশন কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার অ্যাকাউন্টে ভর্তুকির টাকা (Direct Benefit Transfer) পাঠানো সম্ভব। এতে সরকারের অপচয় কমবে এবং আসল মানুষ সুফল পাবে।

খ) বাজার মনিটরিং: ঠুঁটো জগন্নাথ থেকে সক্রিয় পাহারাদার

  • মোবাইল কোর্ট ও তাৎক্ষণিক জরিমানা: জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসন যদি প্রতিদিন প্রতিটি জেলা-উপজেলায় খুচরা ও পাইকারি বাজারে ঝটিকা অভিযান চালায়, তবে অসাধু ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে বাধ্য হবে।
  • ডিলারশিপ বাতিল ও কালো তালিকাভুক্তি: যেসব কোম্পানি বা বড় পরিবেশক কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বিইআরসি-র নির্দেশ অমান্য করছে, তাদের লাইসেন্স ও ডিলারশিপ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাতিল করার কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে।
  • ডিজিটাল ট্র্যাকিং: প্রতিটি সিলিন্ডারের গায়ে সরকার নির্ধারিত বিক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে কিউআর কোড (QR Code) বা বারকোডের মাধ্যমে ট্র্যাক করার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে ভোক্তা সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে জালিয়াতি ধরতে পারেন।

প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় রান্নায় ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) নির্ধারিত মূল্যে এক অভূতপূর্ব ও বৈসাদৃশ্যমূলক চিত্র দেখা গেছে। সমসাময়িক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি কেজি এলপিজির নির্ধারিত দাম ১৫৩ টাকা হলেও ভারতের কলকাতায় তা মাত্র ৮৭ টাকা। এমনকি পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলোতেও এই দাম বাংলাদেশের চেয়ে বহুলাংশে কম। ভৌগোলিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক বাজারের সমতা থাকা সত্ত্বেও এই বিপুল বৈষম্য কেন? 

এটি কি কেবলই কোনো ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও বিপণন কাঠামোগত দুর্বলতা?

দামের এই আকাশ-পাতাল বৈষম্যের মূল কারণসমূহ :

ব্যবসায়িক ও বাজার কাঠামোর নিরিখে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার এই দামের তারতম্যকে প্রধানত তিনটি বড় নিয়ামকের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়:

নিয়ামকভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ

  • রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি নীতি: বাংলাদেশের এলপিজি খাতটি প্রায় ৯৫ শতাংশ বেসরকারি অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। ফলে এখানে সাধারণ ভোক্তার জন্য সরাসরি কোনো রাষ্ট্রীয় বা সাধারণ ভর্তুকির ব্যবস্থা নেই। অন্যদিকে, ভারতে 'উজ্জ্বলা যোজনা' সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের শক্তিশালী ভর্তুকি ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে।
  • আমদানি ও অবকাঠামোগত খরচ: বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮.৫ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে থাকে। ছোট ছোট লাইটারেজ জাহাজে করে পণ্য আনায় এখানে পরিবহন খরচ অনেক বেশি এবং সেই সাথে দেশের বর্তমান ডলার সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এর বিপরীতে, ভারতের রয়েছে বিশাল রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, যার মাধ্যমে সরাসরি পাইপলাইন সরবরাহ এবং সরাসরি বড় মাদার ভেসেল ভেড়ানোর সুবিধা পাওয়া যায়।
  • বাজার তদারকি ও সিন্ডিকেট: বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) প্রতি মাসে দর নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকরের ক্ষেত্রে চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও তদারকির অভাব বিদ্যমান। অপরদিকে, ভারতে ইন্ডিয়ান অয়েল (আইওসিএল)-এর মতো রাষ্ট্রীয় বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বাজার ও সরবরাহ চেইন নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

হরমুজ প্রণালী ও ভূ-রাজনীতির প্রভাব কি এখানে রয়েছে?

বিশ্বের মোট এলপিজি ও জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হরমুজ প্রণালী হয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকট, যুদ্ধাবস্থা বা উত্তেজনা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম (সৌদি সিপি) এবং জাহাজ ভাড়া (Freight Charge) একলাফে বেড়ে যায়।

তবে মনে রাখতে হবে, এই ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। কারণ দুই দেশই একই আন্তর্জাতিক উৎস থেকে এলপিজি বা এর কাঁচামাল আমদানি করে। সুতরাং, কলকাতার তুলনায় বাংলাদেশের বাজারে দাম দ্বিগুণ হওয়ার জন্য হরমুজ প্রণালী বা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এককভাবে দায়ী নয়; বরং দায়ী বাংলাদেশের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতি ও দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা।

  • কাগজে-কলমে দর বনাম বাস্তবতার ফারাক: বিইআরসি (BERC) ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে ১,৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও, মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকট ও বেশি দামে ডলার কেনার অজুহাতে ভোক্তাদের কাছ থেকে ২,৩০০ থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছেন।
  • আমদানি হ্রাস ও ডলার সংকট: ঋণপত্র (LC) খোলার জটিলতা এবং ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানিকারকদের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সামগ্রিক দায় সরাসরি চাপছে সাধারণ ভোক্তার কাঁধে।

কলকাতা ও ঢাকার এই গ্যাস বৈষম্য কোনো বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র বা দূরবর্তী ভূ-রাজনীতির অনিবার্য অংশ নয়, বরং এটি সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ বাজার তদারকির অভাব, আমদানির নীতিগত দুর্বলতা এবং রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির কৌশলগত পার্থক্যের ফল। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে বা ডলার সংকটের গল্প শুনিয়ে ভোক্তাকে শোষণ করার এই প্রক্রিয়া রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব। সরকার যদি দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখায়, তবে আজ রাতে নেওয়া একটি সঠিক সিদ্ধান্তই আগামীকাল সকালেই দেশের কোটি পরিবারের রান্নাঘরে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।

 

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator