শনিবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সেমিনারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন বিন্যাস এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি কেবল শ্রমিক পাঠানো ও রেমিট্যান্স আহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে বিস্তৃত করার কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতিমন্ত্রী বিশেষ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, মক্কা ও মদিনার পবিত্রতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান আপসহীন এবং সৌদি আরবের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের সহযোগিতার অনুরোধ এলে তা রক্ষায় বাংলাদেশ সর্বদা প্রস্তুত। এই কূটনৈতিক অবস্থান কেবল ধর্মীয় সংহতি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি ইঙ্গিতবাহী বার্তা হিসেবে বিশ্লেষিত হচ্ছে। বিশেষ করে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের আগ্রহ সেই দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মিত্রতা তৈরিরই একটি অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর সর্বাধিক জোর দিচ্ছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, সৌদি আরব বর্তমানে বাংলাদেশে বড় অংকের বিনিয়োগকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার একটি বড় উদাহরণ হলো স্টার রিফাইনারি-২ প্রকল্পে ২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ। এই বিনিয়োগ প্রবাহ প্রমাণ করে যে, সৌদি আরব এখন বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অংশীদার। তবে কেবল বিনিয়োগ নয়, দেশটিতে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর বিষয়টিও দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে তালিকায় রাখা হয়েছে। সৌদি আরবের শ্রমবাজারকে আরও সমৃদ্ধ করতে বাংলাদেশের শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রথাগত শ্রমিক রপ্তানির বাইরে গিয়েও উচ্চতর প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক খাতে সৌদি আরবের সাথে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব হয়।
সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সাফল্যকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের মতে, সৌদি আরবের সাথে সম্পর্কের এই নতুন মোড় কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক নীতিতেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। একইসাথে জাপানসহ বিশ্বের অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির দেশের সাথেও বিনিয়োগ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। আগামী ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে কেন্দ্র করে জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
পরিশেষে, সৌদি আরবসহ অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সাথে বাংলাদেশের এই কৌশলগত রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। প্রচলিত শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগবান্ধব অংশীদারিত্বের এই নীতি কার্যকর হলে তা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও কর্মসংস্থান খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে কেবল সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশের মান আরও উন্নত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সুশাসন বজায় রাখা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।