ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কথিত কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে গত কয়েক দিনে দেশজুড়ে যে উত্তাপ ছড়িয়েছে, তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে রাষ্ট্রপতি ভবনে। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করছে এবং ভোটার তালিকা থেকে কৌশলে ১৩ কোটিরও বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকের পর রাহুল গান্ধী দাবি করেন, তারা রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাচনী অনিয়মের অকাট্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন এবং রাষ্ট্রপতি তাদের বক্তব্য শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। যদিও রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে এই আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি, উল্টো রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ানোর জন্য বিরোধীদের কর্মকাণ্ডকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছে দায়িত্বশীল একটি সূত্র। এই ঘটনাটি মূলত ভারতের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থার সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা স্মারকলিপিতে বিরোধীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ এবং নির্বাচন কমিশনারদের দায়মুক্তির সুরক্ষা প্রদানকারী আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। বিরোধী নেতাদের মতে, নির্বাচন কমিশন ও বর্তমান সরকারের মধ্যে গোপন আঁতাত বিদ্যমান, যা গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করছে। মিছিল ও বিক্ষোভের মাধ্যমে তারা ‘জ্ঞানেশ, তোমার খেলা শেষ’ স্লোগান তুলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। ভুক্তভোগী বিরোধী জোটের নেতাদের অভিযোগ, গত দুই বছরের বিভিন্ন বিধানসভা নির্বাচনে যে কারচুপির তথ্য তাদের হাতে রয়েছে, তা কেবল একটি রাজনৈতিক অভিযোগ নয়, বরং এটি ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। তারা কাগজের ব্যালট পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন, কারণ বর্তমান ইভিএম ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ ভোটারের মনে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে এবং অধিকাংশ নাগরিক মনে করছেন তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হচ্ছে।
ঘটনার বিপরীতে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। বিজেপির মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী অভিযোগ করেছেন যে, কংগ্রেস ও তাদের মিত্ররা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিতর্কিত করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছে। তার মতে, রাষ্ট্রপতি ভবনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলা বিরোধীদের একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। এদিকে, বিরোধীরা তাদের আন্দোলনের পরবর্তী ধাপ হিসেবে ভারতের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী সোমবার সুপ্রিম কোর্টে স্মারকলিপি জমা দেওয়ার মাধ্যমে তারা বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করবে। প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক দোষারোপের এই খেলায় সরকারি ও বিরোধী পক্ষ এখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিটি ক্রমাগত উপেক্ষিত হচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরানোর এই লড়াই কেবল একটি রাজনৈতিক দাবি নয়, বরং এটি দেশটির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন পরিচালনার প্রক্রিয়ায় যে অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে, তা নিরসন না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার অভাব যেভাবে প্রকট হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে নির্বাচন কমিশন ও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা আগামী দিনগুলোতে ভারতের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।