হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘনকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে প্রতি রাতেই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। সংস্থাটির নৌবাহিনীর রাজনৈতিক উপপ্রধান আলী মোহাম্মাদি জানিয়েছেন, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরান তার নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ও নজরদারি বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। যুদ্ধের শুরু থেকেই আইআরজিসি নৌবাহিনী এই প্রণালির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের আক্রমণাত্মক বা প্রতিরক্ষামূলক অভিযান পরিচালনার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে। কার্যত, ইরানের সীমানা বা নির্ধারিত নিয়ম অমান্যকারী যেকোনো জলযানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তেহরান তাদের সামরিক উপস্থিতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে। এই পদক্ষেপটি সরাসরি হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে, যেখানে ইরান যেকোনো সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা রাখে বলে দাবি করা হয়েছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের এই কঠোর অবস্থানের ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বিভিন্ন দেশের জাহাজগুলো এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে, নিয়ম লঙ্ঘনের দোহাই দিয়ে যেভাবে প্রতি রাতে অভিযান পরিচালনার দাবি করা হচ্ছে, তা সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাভাবিকতাকে ব্যাহত করছে। আলী মোহাম্মাদির দাবি অনুযায়ী, ইরানের নৌবাহিনী নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে নিয়মভঙ্গকারী জাহাজগুলোকে চিহ্নিত করছে এবং তাদের ওপর তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। এই পরিস্থিতির ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের রুট পরিকল্পনা ও নিরাপত্তার বিষয়টিকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। ভুক্তভোগী জাহাজগুলোর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পাওয়া গেলেও, ইরানের এই একতরফা কঠোর অবস্থানের কারণে অঞ্চলটিতে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে এবং ব্যবসায়িক জাহাজগুলোর কর্মীরা নিয়মিত আতঙ্কের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে, এই উত্তেজনার প্রেক্ষিতে ইরান উল্টো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা গণমাধ্যমের দিকে আঙুল তুলেছে। আলী মোহাম্মাদি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে দৈনিক তেল পরিবহনের যে পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রচার করছেন, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাঁর মতে, প্রতিদিন ৩০ লাখ থেকে ৮০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের এই তথ্য মূলত তেলের বাজারকে প্রভাবিত করতে এবং কৃত্রিমভাবে দাম কমানোর উদ্দেশ্যে ছড়ানো একটি প্রচারণা। ইরানের দাবি, পারস্য উপসাগর ও বৃহত্তর অঞ্চলে বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র দায়ী। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ফলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার চেয়ে সংঘাতের পথই প্রশস্ত হচ্ছে, যা সমাধানের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি করিডোরটি দিয়ে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়, তাতে ইরানের এই সামরিক তৎপরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। হরমুজ প্রণালিতে নিয়মিত শাস্তিমূলক অভিযানের খবর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তার সাথে জড়িয়ে থাকা এই প্রণালিতে কোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা বা নিয়ম নিয়ে বিরোধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। ইরান যদি তাদের এই কঠোর অবস্থান থেকে সরে না আসে বা কোনো আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতা প্রক্রিয়া শুরু না হয়, তবে এই জলপথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।