শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মতিউর রহমান সাগরকে প্রাথমিক সদস্য পদসহ দলীয় সব পদ ও দায়িত্ব থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে জেলা বিএনপির সভাপতি সফিকুর রহমান কিরণ ও সাধারণ সম্পাদক সরদার এ কে এম নাসির উদ্দিন কালুর নির্দেশক্রমে এই বহিষ্কারাদেশ কার্যকর করা হয়। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ, অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাকে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হলো। জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ কামরুল হাসান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দলের আদর্শ ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের কারণেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত সোমবার বিকালে নড়িয়া উপজেলার বাংলা বাজার এলাকায় নির্বাচনি বিলবোর্ড লাগানোকে কেন্দ্র করে, যেখানে জুলাই বিপ্লবের শহীদ মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের পরিবারের সদস্যদের সাথে সাগরের হাতাহাতি ও মারধরের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার রেশ ধরে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সাথে তার চরম বিতর্ক ও হুমকির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, মতিউর রহমান সাগর ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে জুলাই শহীদ অর্ণবের চাচা আব্দুস সালামকে মারধর করেন এবং তাকে ভিত্তিহীনভাবে ফ্যাসিস্ট ও যুবলীগ আখ্যা দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করার অপচেষ্টা চালান। সাগরের দাবি ছিল, আব্দুস সালাম তার নির্বাচনি ব্যানার ছিঁড়েছেন, যার প্রেক্ষিতে বিস্ফোরক আইনের মামলায় তাকে গ্রেফতারের দাবি জানান তিনি। তবে নড়িয়া থানার পুলিশ তদন্তে কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দিতে চাইলে সাগর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং ওসির উদ্দেশ্যে অশালীন ও হুমকি প্রদর্শনমূলক বক্তব্য দেন। ভিডিও ক্লিপে তাকে বলতে শোনা যায়, বাহার যে পথে গেছে, আপনিও সেই পথে যাবেন। এই ধরণের আচরণ কেবল প্রশাসনের কাজের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ নয়, বরং ভুক্তভোগীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এর আগেও সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে থানায় অন্তত ছয়টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রয়েছে, যা তার দীর্ঘদিনের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।
দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ফেরাতে জেলা বিএনপির এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় রাজনীতিকদের একটি অংশ। বহিষ্কারাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৮ জুলাই তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা সত্ত্বেও তিনি তার কর্মকাণ্ডে কোনো পরিবর্তন আনেননি, বরং একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এই ঘটনার অনুলিপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও ফরিদপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ এমপির কাছে পাঠানো হয়েছে। যদিও বহিষ্কারের প্রতিক্রিয়ায় মতিউর রহমান সাগর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করে এক প্রকার তাচ্ছিল্যভরা স্ট্যাটাস দিয়েছেন, তবুও মাঠপর্যায়ে তার এই বহিষ্কারাদেশকে দলের অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে যে, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়েই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা পুলিশকে হুমকির মুখে ফেলা গ্রহণযোগ্য নয়।
মতিউর রহমান সাগরের বহিষ্কারাদেশ শরীয়তপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় রাজনীতিতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও পেশিশক্তির দাপট যে দলের মূলধারার জন্য কতটা ক্ষতিকর, এই ঘটনাটি তার একটি বড় দৃষ্টান্ত। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জিডি এবং বর্তমানের এই নগ্ন আচরণের পর তার বহিষ্কার সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। তবে শুধু বহিষ্কারই যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, কারণ তার বিরুদ্ধে থাকা একাধিক মামলা ও জিডির আইনি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে এ ধরনের কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ পদক্ষেপ ভবিষ্যতে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আইন মান্য করার প্রবণতা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।