পঞ্চগড়-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মো. নাইমুজ্জামান ভূইয়া ওরফে মুক্তাকে মঙ্গলবার সকাল ৭টার দিকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশ। কাজীপাড়া এলাকায় অবস্থিত বাসভবন থেকে আটকের পর তাকে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সদর থানায় নেওয়া হয় এবং প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। জুলাই মাসে সংগঠিত গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন ইজিবাইক চালক আল আমিনকে গুম ও হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামিদের একজন তিনি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল, তবে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশি অভিযানে তার অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, যার অবসান এই গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে শুরু হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাবেক এই এমপির বিরুদ্ধে আল আমিন হত্যা মামলা ছাড়াও বিএনপি কার্যালয় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং সহিংসতাসহ মোট ১২টি গুরুতর মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগী আল আমিনের পরিবারের অভিযোগ, জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে নাইমুজ্জামান মুক্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশে তার অনুসারীরা সাধারণ মানুষের ওপর চড়াও হয়েছিল। ইজিবাইক চালক আল আমিনকে গুমের পর হত্যার ঘটনায় পরিবারটি এখনো শোকের ছায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তাদের দাবি শুধু গ্রেফতার নয়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয়রা বলছেন, মুক্তার ক্ষমতার দাপটে এতদিন কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মামলার এজাহারভুক্ত হওয়ার পর তার অপরাধের প্রকৃত চিত্র জনসমক্ষে উঠে আসছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো পঞ্চগড়ের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চরমভাবে বিঘ্নিত করেছিল, যার দায়ভার সাবেক এই সংসদ সদস্য এড়াতে পারেন না।
গ্রেফতারের বিষয়ে পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আইন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করা হবে। জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নাইমুজ্জামান মুক্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ বা তার সমর্থক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে দলীয় শীর্ষ নেতাদের অনেকেই পলাতক থাকায় তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, এই গ্রেফতারের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা প্রমাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং অপরাধী যেই হোক না কেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করা উচিত নয়।
এই গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে পঞ্চগড়ের স্থানীয় রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসানের প্রত্যাশা করছেন সাধারণ মানুষ। তবে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম কতটা স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়, তা এখন দেখার বিষয়। ইজিবাইক চালক আল আমিনের মতো সাধারণ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা নির্মূলে এই গ্রেফতার একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে পরিবহন খাতসহ স্থানীয় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এই ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি, যাতে করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ আর ভবিষ্যতে এমন অমানবিক কর্মকাণ্ড ঘটানোর সাহস না পায়।