হাজীগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট: সম্পদ ও বিনিয়োগের গোলকধাঁধায় ৮ কোটি টাকার ঋণ ও স্বচ্ছতার সংকট.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

হাজীগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট: সম্পদ ও বিনিয়োগের গোলকধাঁধায় ৮ কোটি টাকার ঋণ ও স্বচ্ছতার সংকট..

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
হাজীগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট: সম্পদ ও বিনিয়োগের গোলকধাঁধায় ৮ কোটি টাকার ঋণ ও স্বচ্ছতার সংকট..
হাজীগঞ্জ ওয়াকফ এস্টেট: সম্পদ ও বিনিয়োগের গোলকধাঁধায় ৮ কোটি টাকার ঋণ ও স্বচ্ছতার সংকট..
ছবি: সংগৃহীত
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ ও আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াকফ এস্টেটের বিপুল সম্পদ, ব্যাংক ঋণ এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য, যা এখন আইনি ও প্রশাসনিক পর্যালোচনার দাব..

চাঁদপুরের ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ ও আহমাদ আলী পাটওয়ারী ওয়াকফ এস্টেটের সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ওয়াকফ এস্টেটের মোতওয়াল্লী পক্ষের দাবি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠাতা আহমাদ আলী পাটওয়ারীর দান করা ১ দশমিক ১৯ একর সম্পত্তি থেকে বর্তমানে এর পরিমাণ ৯ দশমিক ৭০ একরে উন্নীত হয়েছে। তবে এই বিশাল সম্পত্তি বৃদ্ধিতে কোনো দলিল বা আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক এই এস্টেটটি বর্তমানে ৮ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ, একাধিক মার্কেট থেকে আয়ের উৎস নিয়ে অস্পষ্টতা এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত না দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগের মুখে পড়েছে। হাজীগঞ্জ প্লাজা, হাজীগঞ্জ টাওয়ার ও রজনীগন্ধা মার্কেটসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রকল্পের আয় ও ব্যয়ের হিসাব না মেলায় স্থানীয় মহলে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এখন মামলার রূপ নিয়েছে। ঘটনার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, ওয়াকফ প্রশাসনের নথিপত্র এবং বাস্তবে মাঠপর্যায়ের হিসাবের মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে, যা প্রশাসনিক নজরদারিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, এস্টেটের অধীনে থাকা বিভিন্ন মার্কেটে বিনিয়োগ করেও তারা মূলধন বা মুনাফা কিছুই পাচ্ছেন না। ভুক্তভোগীদের দাবি, অন্তত ২০ জন আত্মীয়ের ৮২ লাখ টাকা শেয়ার এবং চারটি দোকানের বরাদ্দ বাবদ ৫৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হলেও তার কোনো সুরাহা মিলছে না। মোতওয়াল্লী পক্ষ দাবি করছে, হযরত মকিমউদ্দিন শপিং সেন্টারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে ইসলামী ব্যাংক থেকে দুই ধাপে ৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে এবং সেই দায় মেটাতে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে এই দাবির সপক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সম্পত্তির বিক্রয় দলিল কিংবা ঋণ পরিশোধের অডিট রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঠিকাদার ও হিসাবরক্ষকের যোগসাজশে ভুয়া ভাউচার ও অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে এস্টেটের তহবিল তছরুপ করা হয়েছে, যার ফলে আজ এস্টেটটি দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা তাদের জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াকফ প্রশাসনের যথাযথ অনুমোদন ছিল কি না, কিংবা ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পত্তির বৈধতা কতটুকু, তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি মোতওয়াল্লী পক্ষ। ঠিকাদার ও হিসাবরক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। বর্তমানে ওয়াকফ এস্টেটকে ঘিরে সৃষ্ট একাধিক মামলা আদালতে বিচারাধীন, যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান রক্ষায় মরিয়া। তবে আইনি লড়াইয়ের বাইরেও প্রশাসনিক অডিট ও ওয়াকফ প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া এই আর্থিক বিশৃঙ্খলা নিরসন অসম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। এস্টেটের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব, প্রকৃত বিনিয়োগকারীর তালিকা এবং প্রকল্পের বাস্তব ব্যয়ের অডিট রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করাই এখন সংকট সমাধানের একমাত্র পথ।

ওয়াকফ এস্টেটের এই সংকট শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি ধর্মীয় ও জনস্বার্থের সাথে সরাসরি জড়িত। সম্পদের সঠিক হিসাব ও বিনিয়োগকারীদের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতা ভবিষ্যতে এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি চরম সংকটে ফেলবে। যদি নথিপত্র ও ব্যাংক স্টেটমেন্টের মাধ্যমে প্রতিটি লেনদেনের হিসাব স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা না হয়, তবে জনআস্থা পুনরুদ্ধারের কোনো সুযোগ থাকবে না। হাজীগঞ্জের এই ধর্মীয় স্থাপনাটি যেন কোনো কুচক্রী মহলের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও ওয়াকফ প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নথির সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমেই কেবল এই অস্পষ্টতা দূর করা সম্ভব, নতুবা মামলা ও পাল্টা মামলার জালে আটকে পড়বে এস্টেটের ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের নিরাপত্তা।

Комментариев нет


News Card Generator