আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ এবং তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত রোববার সংস্থাটির সহকারী পরিচালক তানজীর আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, কাজী জাফরউল্লাহ, তার স্ত্রী নিলুফার জাফরউল্লাহ এবং তাদের তিন সন্তান কাজী ওমর জাফর, কাজী রায়হান জাফর ও কাজী আনসকা মেহরিন জাফরের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্ছিত ১৫৫ কোটি ১ লাখ ৪২ হাজার ৭০৮ টাকা এবং ১ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার অবরুদ্ধ করার জন্য কমিশন অনুমোদন দিয়েছে। মূলত এসব বিশাল অংকের অর্থের বৈধ উৎস এবং আয়ের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাইয়ের জন্য অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মো. শহীদুর রহমান কাজ করছেন। রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার্থে এবং এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ যেন কোনোভাবেই হস্তান্তর বা স্থানান্তর না হয়, তা নিশ্চিত করতেই আদালত বরাবর সম্পত্তি অবরুদ্ধের এই আবেদন দাখিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, কাজী জাফরউল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে মেঘনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক এবং প্রিমিয়ার ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিশাল অংকের এফডিআর ও নগদ অর্থের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কাজী জাফরউল্লাহর একক নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ৫৪ কোটি ১৮ লাখ ৮১ হাজার ৮৫২ টাকা, তার স্ত্রী নিলুফার জাফরউল্লাহর নামে ২৬ কোটি ৮৪ লাখ ৩৩ হাজার ৫৯৫ টাকা এবং তাদের সন্তানদের নামে আরও প্রায় ৭৪ কোটি টাকার অধিক অর্থ জমা রয়েছে। বিশেষ করে বনানীর হংকং সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনসহ (এইচএসবিসি) অন্যান্য ব্যাংকে থাকা এই অর্থের উৎস নিয়ে বর্তমানে কঠোর তদন্ত চলছে। পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের অস্বাভাবিক স্তূপ এবং এর সাথে বৈদেশিক মুদ্রার উপস্থিতি তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এত বিশাল পরিমাণ অর্থ কোনো স্বীকৃত আয়ের উৎসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর রহস্য। দুদক কর্তৃপক্ষ মনে করছে, অনুসন্ধান চলাকালীন এই অর্থ যদি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে ফেলা হয় বা অন্য কোনো নামে হস্তান্তর করা হয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনবে। এই কারণেই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাংকগুলোতে থাকা আমানতগুলোর ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে আদালতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা চাপের তোয়াক্কা না করে এই সম্পদের প্রকৃত উৎস উন্মোচনে বদ্ধপরিকর। যদিও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই বিশাল অংকের অর্থের বৈধতা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা বিবৃতি পাওয়া যায়নি, তবে দুদক তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রতিটি লেনদেনের ট্রেইল বা উৎস বিশ্লেষণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অবৈধ সম্পদ আহরণের এই চিত্র জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। কাজী জাফরউল্লাহ পরিবারের এই বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান ও তা অবরুদ্ধের উদ্যোগটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের কঠোর অবস্থানের একটি বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের তদন্ত প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যাতে করে জাতীয় সম্পদের আত্মসাৎ রোধ করা সম্ভব হয়। এই অনুসন্ধান যদি সঠিক পথে পরিচালিত হয় এবং দুর্নীতির প্রমাণ মেলে, তবে তা কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায়ই সহায়তা করবে না, বরং জনমনে সরকারি কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতি আস্থাও ফিরিয়ে আনবে।