পোশাকি ধার্মিকতা ও কাগজের ঈমান এবং যখন ইবাদত হয় অহংকারের হাতিয়ার.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পোশাকি ধার্মিকতা ও কাগজের ঈমান এবং যখন ইবাদত হয় অহংকারের হাতিয়ার..

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
পোশাকি ধার্মিকতা ও কাগজের ঈমান এবং যখন ইবাদত হয় অহংকারের হাতিয়ার..
পোশাকি ধার্মিকতা ও কাগজের ঈমান এবং যখন ইবাদত হয় অহংকারের হাতিয়ার..
ছবি: সংগৃহীত
তথাকথিত সাধুদের মুখে লেগেই থাকে অন্যের জন্য অভিশাপ আর কুৎসা। অথচ নিজের অতীত পাপের পাহাড় ভুলে গিয়ে, তারা বর্তমানের তথাকথিত 'পবিত্র' রূপ নিয়ে অন্যের অতীত খুঁড়ে কুৎসা রটায়।..

 

- সালাউদ্দিন আকবর , কেরানীগঞ্জ ,ঢাকা

 

 

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালজুড়ে হাদিস আর ইসলামিক বাণীর ছড়াছড়ি। কেউ লিখছেন অন্যের হক নষ্ট করার ভয়াবহতা নিয়ে, কেউ বোনের সম্পত্তি আত্মসাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার, আবার কেউ পোস্ট করছেন—"কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ সুখী হতে পারে না।

" অথচ নিখুঁত এই ভার্চুয়াল পর্দার আড়ালে খোঁজ নিলে দেখা যায়, যিনি লিখছেন, বাস্তব জীবনে তিনিই হয়তো সবচেয়ে বড় ঠকবাজ। ঘরের কোণে বসে নিষিদ্ধ কলা খেয়ে মুখে "সাধু" সাজার এই অভিনয় আজকাল অহরহ দৃশ্যমান।

এই যে বছরে বছরে উমরাহ করা, পাঁচ ওয়াক্ত কপালে দাগ ফেলা নামাজ, কিংবা রোজা রাখা—এসব বাহ্যিক ইবাদত কি আসলেই আল্লাহর দরবারে পৌঁছাচ্ছে? নাকি এগুলো কেবলই মনের ভেতর এক পাহাড় সমান আত্মঅহমিকা (কিবর) তৈরি করছে, যা মানুষকে ভাবায়—"আমার চেয়ে বড় পরহেজগার আর কে আছে?"

মানুষের পাওনা বা হক নষ্ট করে যারা মনে করে পার পেয়ে যাবে, তাদের আসল রূপ এই হাদিসে স্পষ্ট:
হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কি জানো দেউলিয়া কে?" তারা বললেন, যার টাকা-পয়সা নেই। 

রাসুল (সা.) বললেন, "আমার উম্মতের মধ্যে আসল দেউলিয়া সে, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা, যাকাত নিয়ে হাজির হবে; কিন্তু সে দুনিয়ায় কাউকে গালি দিয়েছিল, কারও অপবাদ রটিয়েছিল, কারও সম্পদ আত্মসাৎ করেছিল (যেমন বোনের হক), কাউকে আঘাত করেছিল। তখন তার নেকিগুলো ওই মজলুমদের দিয়ে দেওয়া হবে। একপর্যায়ে তার নেকি শেষ হয়ে গেলে মজলুমদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।" 

(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৮১)

ইসলামের চিরন্তন সত্য হলো, লোকদেখানো ইবাদত (রিয়া) এক ধরণের গোপন শিরক। তাহলে প্রশ্ন জাগে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই বিখ্যাত হাদিসগুলো কাদের জন্য? যেখানে বলা হয়েছে—নামাজ-রোজা করেও বহু মানুষ জাহান্নামী হবে। 
হ্যাঁ, সেই হাদিসগুলো ঠিক এই শ্রেণির মানুষদের জন্যই, যারা ইবাদতকে বানিয়েছে লোকদেখানোর মাধ্যম আর মনকে বানিয়েছে অহংকারের আস্তানা।

ফেসবুকে বা সমাজে যারা লোকদেখানোর জন্য ইবাদত করে এবং মনে অহংকার রাখে, তাদের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
হাদিস: "কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম একজন শহীদ, একজন আলেম এবং একজন দানশীল ব্যক্তিকে দিয়ে জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে। কারণ তারা ইবাদত করেছিল যাতে মানুষ তাদের বীর, বড় আলেম বা দানশীল বলে।" 
(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯০৫)

অহংকার সম্পর্কে: "যার অন্তরে সরিষা দানা পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৯১)

শুধু তাই নয়, এই তথাকথিত সাধুদের মুখে লেগেই থাকে অন্যের জন্য অভিশাপ আর কুৎসা। অথচ নিজের অতীত পাপের পাহাড় ভুলে গিয়ে, তারা বর্তমানের তথাকথিত 'পবিত্র' রূপ নিয়ে অন্যের অতীত খুঁড়ে কুৎসা রটায়। ইসলামে অন্যকে অভিশাপ দেওয়া এবং গীবত বা কুৎসা রটানোকে নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য বলা হয়েছে।

মানুষের অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা এবং পেছনে নিন্দা করার ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:
কুরআন: "তোমরা একে অপরের অনুপস্থিতিতে নিন্দা (গীবত) করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে?" (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২)

হাদিস: "চোগলখোর (যে অন্যের কুৎসা রটিয়ে বেড়ায়) জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬০৫৬)

কারও কথায় কথায় মানুষকে অভিশাপ দেওয়ার অভ্যাস থাকলে তাদের অবস্থান সম্পর্কে বলা হয়েছে:
হাদিস: "অভিশাপকারীরা কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হতে পারবে না এবং সাক্ষীও হতে পারবে না।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৯৮)

হাদিস: "মুমিন ব্যক্তি কখনো লানতকারী (অভিশাপকারী) হতে পারে না।" (জামে আত-তিরমিজি, হাদিস নং: ১৯৭৭)

এর চেয়েও ভয়ানক চিত্র দেখা যায় সুদের কারবারে। যারা সুদের মূল টাকার জন্য মানুষের গলায় ছুরি ধরতে দ্বিধা করে না, আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। সুদখোরের ইবাদত তো দূরের কথা, তার রক্ত-মাংসই জাহান্নামের আগুন পাওয়ার যোগ্য।

সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে আল্লাহ সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন:
কুরআন: "যদি তোমরা সুদ বর্জন না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা শুনে নাও।" (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৯)

হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদখোর, সুদদাতা, সুদের লেখক এবং এর দুই সাক্ষীকে লানত (অভিশাপ) করেছেন এবং বলেছেন, "তারা সবাই সমান অপরাধী।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৫৯৮)

আসুন, ফেসবুকের টাইমলাইনকে ভণ্ডামির চাদরে না ঢেকে, নিজের ভেতরটাকে পরিষ্কার করি। ইবাদত যেন আমাদের বিনয়ী করে, অহংকারী নয়।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। লোকদেখানো ইবাদত, অন্যের হক নষ্ট করা, কুৎসা রটানো এবং অভিশাপ দেওয়ার মতো অন্তরের ব্যাধি থেকে আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন।

Geen reacties gevonden


News Card Generator