আবারও জমল গুড়পুকুর মেলা, প্রাণ ফিরে পেল সাতক্ষীরার লোকঐতিহ্য.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আবারও জমল গুড়পুকুর মেলা, প্রাণ ফিরে পেল সাতক্ষীরার লোকঐতিহ্য..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: avatar   
আবারও জমল গুড়পুকুর মেলা, প্রাণ ফিরে পেল সাতক্ষীরার লোকঐতিহ্য..
আবারও জমল গুড়পুকুর মেলা, প্রাণ ফিরে পেল সাতক্ষীরার লোকঐতিহ্য..
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবারও প্রাণ ফিরে পেল সাতক্ষীরার প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা: 

দীর্ঘ দুই বছর বন্ধ থাকার পর আবারও প্রাণ ফিরে পেল সাতক্ষীরার প্রায় ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী গুড়পুকুর মেলা।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে আনুষ্ঠানিকভাবে এ মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলা চলবে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও ১ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত মেলা আয়োজনের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

মেলার উদ্বোধন করেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার আবু সালেহ মোহাম্মদ আশরাফুল আলম, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক রহমাতুল্লাহ পলাশ, সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলুসহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

দীর্ঘ বিরতির পর ঐতিহ্যবাহী এ মেলা ফিরে আসায় সাতক্ষীরাজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস। এরই মধ্যে মেলাকে ঘিরে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে দোকানপাট ও বিভিন্ন স্টল স্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

তিন শতকের লোকঐতিহ্য গুড়পুকুর মেলা সাতক্ষীরার অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় লোকজ আয়োজন। প্রায় ৩০০ বছর ধরে ভাদ্র মাসের শেষ দিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মনসা পূজাকে কেন্দ্র করে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। সময়ের সঙ্গে ধর্মীয় আয়োজনের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেলাটি সাতক্ষীরার মানুষের সার্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।

একসময় পলাশপোলের গুড়পুকুরপাড় ও আশপাশের এলাকা ছিল মেলার মূল কেন্দ্র। বর্তমানে জেলা প্রশাসন ও পৌরসভার উদ্যোগে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে মেলার আয়োজন করা হচ্ছে।

মেলায় দেশীয় বিভিন্ন পণ্যের পাশাপাশি কাঠ, মাটি, বাঁশ, বেত ও লোহার তৈরি সামগ্রী, গৃহস্থালি উপকরণ, শিশুদের খেলনা, মৌসুমি ফল, নানা ধরনের খাবার এবং বিভিন্ন প্রজাতির কলম করা গাছ ও চারা পাওয়া যেত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে তাদের পসরা সাজাতেন। একসময় মেলার বিনোদন আয়োজনের মধ্যে নাগরদোলা, সার্কাস, জাদু প্রদর্শনী ও পুতুল নাচও ছিল অন্যতম আকর্ষণ।

গুড়পুকুরের নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা জনশ্রুতি। প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, পলাশপোলের একটি গোলাকৃতির পুকুরের পাড়ে বটগাছের নিচে এক ক্লান্ত পথিক বিশ্রাম নেওয়ার সময় একটি বিষধর সাপ তাকে ছায়া দিয়েছিল। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে সেখানে মনসা পূজার প্রচলন হয়। পূজার মিষ্টি প্রসাদ পুকুরে ফেলার পর পানি মিষ্টি হয়ে যায়—এমন বিশ্বাস থেকেই পুকুরটির নাম হয় ‘গুড়পুকুর’।

তবে এ নামকরণ নিয়ে আরও কয়েকটি মত প্রচলিত রয়েছে। কারও মতে, পুকুরে পূজার বাতাসা ফেলার কারণে পানি মিষ্টি লাগত বলে এর নাম গুড়পুকুর। আবার কেউ বলেন, পুকুরে পানি ধরে রাখতে বিপুল পরিমাণ গুড় ব্যবহারের একটি লোককথা থেকেই নামটির উৎপত্তি। ঐতিহাসিক আবদুস সোবহান খান চৌধুরীর মতে, ‘গৌরদের পুকুর’ কথাটির বিবর্তন থেকেই ‘গুড়পুকুর’ নামের উৎপত্তি হতে পারে।

বোমা হামলার পর বন্ধ হয়েছিল মেলা। আবহমানকাল ধরে চলে আসা এ মেলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ছেদ পড়ে ২০০২ সালে। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর মেলা চলাকালে সাতক্ষীরা শহরের একটি সিনেমা হল এবং স্টেডিয়ামে সার্কাসের প্যান্ডেলে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনজন নিহত এবং শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু আহত হন।

ওই ঘটনার পর নিরাপত্তাজনিত কারণে দীর্ঘ সময় মেলা আয়োজন বন্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে সীমিত পরিসরে আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। ২০২৫ সালেও গুড়পুকুরপাড়ে মনসা পূজা অনুষ্ঠিত হলেও মেলা আয়োজন করা হয়নি বলে সমসাময়িক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

দুই বছর বিরতির পর এবার আবারও মেলা শুরু হওয়ায় ব্যবসায়ী, দর্শনার্থী ও স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন করে উৎসাহ তৈরি হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরার লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির পুরোনো আবহ আরও একবার ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

לא נמצאו הערות


News Card Generator