মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বর্ষিজোড়া গ্রামে ২০২৩ সালের ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় চাঁদা দাবি ও পূর্বশত্রুতার জেরে সংঘটিত নাঈম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। বুধবার সকালে মৌলভীবাজারের দায়রা জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ রবিউল আউয়াল এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় প্রদান করেন। রায়ে মো. নুরুল ইসলাম, মো. সাইমন ইসলাম, নাহিদুল ইসলাম রনি ও আনোয়ার হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার নথি অনুযায়ী, ঘটনার দিন আসামিরা নাঈমের বাবার বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে চাঁদা দাবি করেন এবং তার বাবা-মাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের পাশাপাশি মারধর করেন। এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়েই নাঈম আসামিদের রোষানলে পড়েন এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর জখম হন। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, যা স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক তথ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এই রায় প্রদান করেন, যা ন্যায়বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত আক্রোশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চালানো অপপ্রচার। নাঈমের বাবা চেরাগ মিয়া ও মা শামসুন নাহার জানান, আসামিরা কেবল চাঁদা নিতেই আসেনি, বরং নাঈমকে ব্যক্তিগতভাবে হেনস্তা করার উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিতভাবে তার ওপর আক্রমণ চালায়। ঘটনার সময় নাঈম পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে গেলে তাকে লক্ষ্য করে ধারালো অস্ত্র চালানো হয়, যা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডেরই চূড়ান্ত রূপ। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় বাদীপক্ষ দাবি করেছে যে, আসামিদের এই জঘন্য কর্মকাণ্ড স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছিল। ভুক্তভোগী পরিবার তাদের সন্তানের অকাল মৃত্যুতে যে শোক ও বিচারহীনতার আশঙ্কায় দিন পার করছিল, রায়ের মাধ্যমে সেই দীর্ঘ অপেক্ষার একটি আইনি পরিসমাপ্তি ঘটল। তবে আসামি পক্ষের একটি বড় অংশ খালাস পাওয়ায় এবং মূল আসামিদের মধ্যে দুজন পলাতক থাকায় ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।
আদালতের এই রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন চৌধুরী সন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে, পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন নাঈমের পরিবার। মামলার মোট নয়জন আসামির মধ্যে পাঁচজন খালাস পেলেও, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চারজনের মধ্যে দুজন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্বজনরা। তাদের মতে, পলাতক আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত এই রায় পুরোপুরি কার্যকর হবে না। প্রশাসনিকভাবে পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত করে তাদের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বা তাদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করা ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটাতে কেউ সাহস না পায়।
একটি সাধারণ সন্ধ্যার পারিবারিক বিরোধ থেকে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল, তা মৌলভীবাজারের বিচারিক ইতিহাসে একটি আলোচিত অধ্যায় হয়ে থাকবে। আদালতের এই কঠোর রায় সমাজে অপরাধীদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার করবে এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিচারিক প্রক্রিয়ার এই সফল সমাপ্তি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত হবে এবং দণ্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি কার্যকর হবে। নাঈমের পরিবার ও এলাকাবাসী এখন প্রশাসনের দিকে তাকিয়ে আছে, যাতে আইনের শাসন সমুন্নত থাকে এবং ভবিষ্যতে কোনো তরুণ যেন এ ধরনের নির্মমতার বলি না হয়। ন্যায়বিচার প্রাপ্তির এই দীর্ঘ পথচলা শেষ পর্যন্ত সমাজকে একটি নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত পরিবেশ প্রদানের দিকে পরিচালিত করবে বলে প্রত্যাশা সবার।