নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর মরিয়ম মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজুল ইসলাম এক ছাত্রীকে অপহরণ ও ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ফের জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। গত মঙ্গলবার উচ্চ আদালতের নির্দেশে রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই তিনি কয়েকশ সমর্থক নিয়ে নাজিরপুর এলাকায় একটি সমাবেশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই সমাবেশের ভিডিও ফুটেজে তাকে অত্যন্ত উদ্ধত ও হুমকিমূলক ভঙ্গিতে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। তিনি প্রকাশ্য জনসভায় উপস্থিত জনতার সামনে বিচারিক আদালতের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে বলেন যে, তার বিরুদ্ধে চারজনের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অবৈধ এবং তিনি নিজেই নাজিরপুরের মাটিতে বিচার করবেন। একজন দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি এক ধরণের চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।
ঘটনার ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীর পরিবার বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছে। মামলার বাদী ও নির্যাতিতার পিতা অভিযোগ করেছেন যে, ফিরোজুল ইসলাম কারামুক্ত হওয়ার পর থেকেই তাকে নানাভাবে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন এবং নাজিরপুরের মাটিতেই মামলাটির ফয়সালা করার হুমকি প্রদান করছেন। এর আগেও মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আসামিপক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় টাকার প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল, কিন্তু পরিবারের অটল অবস্থানের কারণে তারা বিচারিক লড়াই চালিয়ে গেছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্যমতে, আদালতের রায়ে তারা ন্যায়বিচারের আশা দেখেছিলেন, কিন্তু আসামির এমন বেপরোয়া আচরণ ও প্রকাশ্যে হুমকি প্রদান তাদের জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, একজন শিক্ষক হয়েও এমন জঘন্য অপরাধের পর জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগীকে হুমকি দেওয়া নৈতিক স্খলনের চূড়ান্ত পর্যায়।
এদিকে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক ফিরোজুল ইসলামের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান জানিয়েছেন, মামলার বাদীকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া মাত্রই আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছেন। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড পাওয়ার পরও আপিল বিভাগের মাধ্যমে জামিন নিয়ে বের হয়ে এসে বাদীকে হুমকি দেওয়ার ঘটনাটি বিচার ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালের ১ অক্টোবর এসএসসি পরীক্ষার সময় ওই ছাত্রীকে অপহরণ করে রাজশাহীর একটি হোটেলে আটকে রেখে ধর্ষণের ঘটনায় ফিরোজুল ইসলামকে ১১ নভেম্বর ২০২৩ সালে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছিলেন আদালত। অপরাধের প্রমাণ হিসেবে পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের সাক্ষ্য এবং ধর্ষণের ভিডিও চিত্র আমলে নিয়েছিলেন বিচারক। বর্তমানে আসামির জামিনে মুক্তি এবং তার পরবর্তী কর্মকাণ্ডের ফলে বিচারপ্রার্থী ওই পরিবারটি তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। অপরাধী যদি আইনকে এভাবে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পায়, তবে সমাজে ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থার অভাব তৈরি হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।