বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রেণী বৈষম্য ও বাণিজ্যিকীকরণ এবং অতীত সাফল্য বনাম বর্তমান বাস্তবতা এবং অভিন্ন শিক্ষাক্রমের যৌক্তিকতা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রেণী বৈষম্য ও বাণিজ্যিকীকরণ এবং অতীত সাফল্য বনাম বর্তমান বাস্তবতা এবং অভিন্ন শিক্ষাক্রমের যৌক্তিকতা..

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রেণী বৈষম্য ও বাণিজ্যিকীকরণ এবং অতীত সাফল্য বনাম বর্তমান বাস্তবতা এবং অভিন্ন শিক্ষাক্রমের যৌক্তিকতা..
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রেণী বৈষম্য ও বাণিজ্যিকীকরণ এবং অতীত সাফল্য বনাম বর্তমান বাস্তবতা এবং অভিন্ন শিক্ষাক্রমের যৌক্তিকতা..
ছবি: সংগৃহীত
ইংরেজি মাধ্যমের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি-কাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা এই কাঠামোগত বৈষম্যেরই একটি খণ্ডচিত্র।..

 

  • সালাউদ্দিন আকবর , ঢাকা 
    ( লেখক ও গবেষক )


১. ভূমিকা

শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার, যা একটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাম্য ও সামাজিক মর্যাদার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের সংবিধানেও সকলের জন্য সমতাভিত্তিক এবং বৈষম্যহীন শিক্ষার অঙ্গীকার করা হয়েছে। তবে গত কয়েক দশকে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক গভীর ও দৃশ্যমান রূপান্তর ঘটেছে। অতীতে যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক পরিবারের সন্তানরা সরকারি ব্যবস্থার ওপর ভর করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারতেন, বর্তমানে সেখানে শিক্ষার সুযোগের পেছনে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা 'শ্রেণী পরিচয়' প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইংরেজি মাধ্যমের ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফি-কাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক, তা এই কাঠামোগত বৈষম্যেরই একটি খণ্ডচিত্র।

২. সোনালী অতীত: প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধার জয়জয়কার

কয়েক দশক আগের বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশের প্রথম সারির নেতৃত্ব—সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি), জেলা প্রশাসক (ডিসি), কিংবা স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) বা চ্যান্সেলর (রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি)—তাদের একটি বিশাল অংশ উঠে এসেছিলেন গ্রামীণ পটভূমি এবং প্রান্তিক পরিবার থেকে।

  • তখনকার অনুঘটক কী ছিল?
    তখন শহর এবং গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম, প্রশ্নপদ্ধতি এবং মূল্যায়নের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান ছিল না। গ্রামীণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাইস্কুলগুলোর মান এবং শহরের ভালো স্কুলের মানের মধ্যে একটি সমতা ছিল। মেধা, কঠোর পরিশ্রম এবং একাগ্রতাই ছিল সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি। রাষ্ট্রীয় বৃত্তি পরীক্ষা (যেমন: পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণীর বৃত্তি) এবং বোর্ড পরীক্ষার মেধা তালিকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জয়জয়কার ছিল একটি নিয়মিত চিত্র। অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা মেধার বিকাশে কোনো স্থায়ী দেয়াল তুলতে পারেনি।

৩. বর্তমান যুগে এই বৈষম্য কেন? (কারণ বিশ্লেষণ)

বর্তমান যুগে এসে শিক্ষা আর কেবল অধিকার বা মেধার বিষয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি অনেকাংশে একটি 'পণ্য' এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই বৈষম্য তৈরি হওয়ার প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও বাজারের বিস্তার: বেসরকারি খাতের অবাধ লাইসেন্সিংয়ের ফলে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে নামী-দামী ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যমের বেসরকারি স্কুল। এই প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা ও কারিকুলাম দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তরিত হয়েছে।
  • বিনিয়োগের অসমতা: যে অভিভাবক এককালীন ৫০,০০০ টাকা এবং মাসিক ১৫,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা বা তার বেশি ফি দিতে পারেন, তার সন্তান শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ল্যাব, উচ্চ প্রশিক্ষিত শিক্ষক, বিশ্বমানের কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ এবং ভাষা দক্ষতার বিশেষ সুযোগ পাচ্ছে। অপরদিকে, প্রান্তিক ও সাধারণ সরকারি স্কুলগুলো বাজেট স্বল্পতা, দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং দুর্বল অবকাঠামোর কারণে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
  • কোচিং ও গাইড বই নির্ভরতা: বর্তমান পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি এতটাই জটিল ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করা হয়েছে যে, প্রাইভেট টিউটর ও ব্যয়বহুল কোচিং সেন্টারের সহায়তা ছাড়া ভালো ফলাফল করা সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। এটিও এক ধরনের পরোক্ষ অর্থনৈতিক বৈষম্য।
  • রাষ্ট্রীয় বাজেটে শিক্ষার অগ্রাধিকারের অভাব: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (ইউনেস্কোর সুপারিশ) অনুযায়ী একটি দেশের জিডিপির (GDP) অন্তত ৬% শিক্ষায় বরাদ্দ থাকা উচিত, যেখানে বাংলাদেশে এটি ঐতিহ্যের নিয়মেই ২% বা তার কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে সরকারি স্কুলের মান উন্নত করে বেসরকারি স্কুলের সাথে প্রতিযোগিতায় নামানো সম্ভব হচ্ছে না।

৪. কেন সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য 'একই শিক্ষাক্রম' হওয়া উচিত?

"সকলের জন্য এক কারিকুলাম বা অভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা" কেবল একটি আবেগীয় দাবি নয়, এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই রাষ্ট্র গঠনের জন্য অপরিহার্য। এর যৌক্তিকতাগুলো হলো:

  • মেধার সমান সুযোগ (Level Playing Field): যখন দেশের রাষ্ট্রপতি ও একজন রিকশাচালকের সন্তান একই বই পড়বে, একই মূল্যায়ন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে যাবে, তখন সমাজ থেকে সুযোগের অসমতা দূর হবে। মেধার সঠিক মূল্যায়ন হবে, টাকার জোরের নয়।
  • সামাজিক সংহতি ও সহমর্মিতা: শৈশব থেকেই যখন শিশুরা বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসে একই ক্লাসরুমে বসবে, তখন তাদের মধ্যে শ্রেণী অহংকার দূর হবে এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা ও জাতীয়তাবোধ দৃঢ় হবে। বর্তমানের বিভক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা (ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম, মাদ্রাসা মাধ্যম) সমাজকে মানসিকভাবে তিন ভাগে বিভক্ত করে দিচ্ছে।
  • জাতীয় মেধার অপচয় রোধ: দেশের ৮০% সাধারণ মানুষের সন্তান যদি নিম্নমানের শিক্ষার কারণে শুরুতেই রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে যাওয়ার প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে, তবে দেশ এক বিশাল মেধা পুল থেকে বঞ্চিত হয়। অভিন্ন ও মানসম্মত শিক্ষাক্রম তৃণমূলের সুপ্ত মেধাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে আনতে সাহায্য করবে।

৫. উপসংহার ও উত্তরণের পথ

কয়েক দশক আগের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা গভর্নর, ডিসি বা ভিসিদের গল্পগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে—যোগ্যতা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণীর একচেটিয়া অধিকার নয়। বর্তমান যুগে ইংরেজি মাধ্যমের  মতো স্কুলের ফি-কাঠামো উচ্চ-বিত্তের জন্য মানানসই হলেও, তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বৈষম্যের দেয়াল খাড়া করছে।

এই বৈষম্য দূর করতে হলে সম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। রাষ্ট্রকে ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যমের এই বিশাল ব্যবধান কমিয়ে একটি 'জাতীয় মানসম্মত সমন্বিত শিক্ষাক্রম' বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে শিক্ষার মান হবে বিশ্বমানের কিন্তু তা হবে সাধারণ মানুষের জন্য সম্পূর্ণ সাশ্রয়ী বা বিনামূল্যে। 

যখন রাষ্ট্র প্রতিটি সরকারি ও সাধারণ বিদ্যালয়কে আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ করবে, তখনই কেবল অতীতের সেই বৈষম্যহীন মেধার জয়জয়কার আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

 

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator