রাজধানীর ইসিবি চত্বর সংলগ্ন দক্ষিণ মানিকদী এলাকায় অবস্থিত নিউ গিনি প্রোপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে সংঘটিত ভয়াবহ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় মিজানুর রহমান নামে আরও একজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। সোমবার রাতে রাজধানীর মাটিকাটা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়, যিনি কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল গফুরের জামাতা হিসেবে পরিচিত। ডিবির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান জানিয়েছেন, গ্রেফতারের সময় সংসদ সদস্য আব্দুল গফুর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। এ নিয়ে আলোচিত এই মামলায় এখন পর্যন্ত মোট ছয়জনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। গত শনিবার রাতের এই আকস্মিক হামলায় পুরো আবাসন প্রকল্প এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, যেখানে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিওটিও হামলার শিকার হয়। মামলার এজাহারভুক্ত ৯ নম্বর আসামি হিসেবে মিজানুর রহমানের গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় ডিবি পুলিশের একাধিক টিম মাঠ পর্যায়ে নিবিড় তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
নিউ গিনি প্রোপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় যে মামলাটি দায়ের করেছেন, তাতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ভুক্তভোগী আবাসন প্রকল্পের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে প্রকল্পের ভেতরে প্রবেশ করে মূল্যবান সম্পদ লুটপাট করে এবং স্থাপনা ভাঙচুর করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, হামলাকারীরা আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়, যা ওই এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। জমির দখল-বেদখল সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরেই এই বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন, এটি কেবল সাধারণ জমি দখলের বিষয় নয়, বরং প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় একটি পরিকল্পিত উচ্ছেদ ও দখলের অপচেষ্টা, যা দীর্ঘ সময় ধরে ওই এলাকায় অস্থিরতা তৈরি করে রেখেছে।
এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেফতারকৃত মিজানুর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় এবং এই ঘটনার সাথে তার সংশ্লিষ্টতার গভীরতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও তিনি সংসদ সদস্যের জামাতা, তবুও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় পুলিশ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তথ্য যাচাই করছে। ডিবির গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার জানিয়েছেন, মামলার এজাহারভুক্ত বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং খুব দ্রুতই ঘটনার মূল হোতাদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। স্থানীয় পর্যায়ে এ ধরনের নজিরবিহীন হামলা ও দখলদারিত্বের ঘটনা প্রশাসনের নজরদারির সীমাবদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, ঘটনার সাথে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিচারের আওতায় আনতে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে স্থানীয়রা মনে করছেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম মামলার এজাহারে থাকায় তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ থাকবে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
রাজধানীর আবাসন খাতে এ ধরনের পেশিশক্তির ব্যবহার এবং আবাসন প্রকল্পগুলোতে সশস্ত্র হামলা বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইসিবি চত্বরের মতো জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে গোলাগুলি ও ভাঙচুরের ঘটনা প্রমাণ করে যে, অপরাধী চক্রগুলো কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের শনাক্ত না করতে পারলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আবাসন খাতের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে পুলিশের কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে—এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায় স্থানীয়রা, যাতে ভবিষ্যতে আর কাউকে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।