জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ এবং উচ্চপর্যায়ের একাধিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সফলভাবে সম্পন্ন করার পর পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষ করে দেশের পথে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সময় গত শুক্রবার রাতে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এমিরেটসের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে তার সফরসঙ্গী ও সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তার এই সফরটি বৈশ্বিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করেছে। দীর্ঘ এই কূটনৈতিক যাত্রার সমাপনী পর্বে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা শেষে তার এই দেশের মাটি স্পর্শ করার বিষয়টি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ও ট্রানজিট পেরিয়ে ফ্লাইটটির আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করার কথা রয়েছে। এই পুরো যাত্রাপথ ও ট্রানজিট প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার জন্য কূটনৈতিক মিশনগুলো তৎপর ছিল।
নিউইয়র্ক সফরের মূল আকর্ষণ ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের ঐতিহাসিক ভাষণ, যেখানে প্রথমবারের মতো তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলায় বক্তব্য প্রদান করেন। নিজের এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংকট নিরসন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দূরদর্শী বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের স্পষ্ট অবস্থান ও জাতীয় অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। বিশ্বমঞ্চে এই জোরালো উপস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল তার নিজেদের কূটনৈতিক স্বার্থই তুলে ধরেনি, বরং বৈশ্বিক দক্ষিণ গোলার্ধের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে একটি শক্ত বার্তা দিয়েছে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিভিন্ন ফোরামে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন, যা দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছে। এছাড়া জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি কর্তৃক আয়োজিত বিশেষ নৈশভোজে অংশ নিয়ে তিনি প্রবাসী বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
এই কূটনৈতিক মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী কেবল সাধারণ পরিষদের আনুষ্ঠানিক অধিবেশনেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং বহুপক্ষীয় কূটনীতির প্রতিটি মোড়কে দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। সফরকালে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, দাতা গোষ্ঠী এবং শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতা দেশের সার্বিক বৈদেশিক নীতিতে একটি নতুন গতিশীলতা এনে দিয়েছে। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর কাড়তে এই সফর অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও দরকষাকষি কেবল বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যকেই নির্দেশ করে না, বরং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
পাঁচ দিনের এই কূটনৈতিক ম্যারাথন শেষ করে প্রধানমন্ত্রীর স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্জিত সাফল্যগুলো এখন জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে হওয়া সমঝোতাগুলো কীভাবে দেশের অর্থনীতি, জলবায়ু সহনশীলতা এবং পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিফলিত হয়, তা এখন দেখার বিষয়। জাতিসংঘে বাংলাদেশের জোরালো ভূমিকা এবং সরকারের কূটনৈতিক এই সক্রিয়তা দেশের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও সুশাসনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনেও পরোক্ষভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তার এই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনেও এক ধরনের প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথকে আরও সুগম করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান জটিল সমীকরণের মাঝে বাংলাদেশের এই কূটনৈতিক অর্জন ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী মাইলফলক হয়ে থাকবে।