মিডিয়া, ওটিটি ও বিজ্ঞাপন খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: স্বচ্ছতার অভাব ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মিডিয়া, ওটিটি ও বিজ্ঞাপন খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: স্বচ্ছতার অভাব ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ

তন্বী আহমেদ  avatar   
তন্বী আহমেদ
মিডিয়া, ওটিটি ও বিজ্ঞাপন খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: স্বচ্ছতার অভাব ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
মিডিয়া, ওটিটি ও বিজ্ঞাপন খাতে দুর্নীতির কালো ছায়া: স্বচ্ছতার অভাব ও নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান মিডিয়া, ওটিটি (Over-The-Top) এবং বিজ্ঞাপন খাত একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, অন্যদিকে তেমনি গভীর অনিয়...

বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান মিডিয়া, ওটিটি (Over-The-Top) এবং বিজ্ঞাপন খাত একদিকে যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, অন্যদিকে তেমনি গভীর অনিয়ম ও দুর্নীতির জালে আটকা পড়ে আছে। এই খাতগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে এবং সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের মন্তব্যে এই খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে আমাদের গভীর উদ্বেগের কারণ।

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক মন্তব্যে জানান, মিডিয়া তালিকাভুক্তি এবং চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি)-তে ব্যাপক দুর্নীতি বিদ্যমান। তিনি উল্লেখ করেন যে, সংবাদপত্রের প্রকৃত প্রচার সংখ্যা নির্ধারণ এবং ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই দুর্নীতি পরিলক্ষিত হয়, যেখানে সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ এবং কিছু সাংবাদিক নেতাও জড়িত থাকেন। একই বছরের মার্চ মাসে কামাল আহমেদ আরও বলেন যে, গণমাধ্যম খাতে 'কালো টাকা' প্রবেশ করেছে এবং জনস্বার্থের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে গণমাধ্যমের মালিকানা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি বিজ্ঞাপনের সুষম বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে শরিফুল ইসলাম খান গণমাধ্যমগুলোতে যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি বিজ্ঞাপনের ন্যায্য বণ্টনের ওপর জোর দেন, যা বর্তমান ব্যবস্থায় অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়। এসব ঘটনা দেশের গণমাধ্যম খাতে বিদ্যমান গভীর অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে, যা শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বস্তুনিষ্ঠতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো দেশে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করলেও, এর নিয়ন্ত্রণ ও রাজস্ব আদায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। সরকার এই বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। 'ওভার দ্য টপ (ওটিটি) কনটেন্টভিত্তিক পরিষেবা প্রদান এবং পরিচালনা এবং বিজ্ঞাপন প্রদর্শন নীতিমালা ২০২১'-এর খসড়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। এই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য হলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, প্রচলিত আইন এবং দেশীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী কোনো কনটেন্ট যেন ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত না হয়, তা নিশ্চিত করা। নীতিমালাটিতে নিবন্ধন, কনটেন্ট প্রচারের নির্দেশনা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বিটিআরসি ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে একটি কমিটি গঠন করে নীতিমালার খসড়া প্রণয়নের জন্য, যা ২০২২ সালের জুনে হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী অবৈধভাবে টিভি চ্যানেল সম্প্রচারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান, যা ওটিটি এবং এফটিপি সার্ভারের মাধ্যমে ঘটে থাকে। এই পদক্ষেপগুলো ওটিটি খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং ২০২৬ সাল নাগাদ এর আকার ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের পূর্বাভাস রয়েছে। তবে, এত বড় একটি বাজার এতদিন কার্যত পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে, যার ফলে সরকারের রাজস্ব আদায়, বিদেশি প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি এবং ভোক্তা সুরক্ষায় ঘাটতি ছিল। এই শূন্যতা পূরণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে 'ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬'-এর খসড়া প্রকাশ করেছে। এই নীতিমালার আওতায় ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব, টিকটকসহ বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য নিবন্ধন নিতে হবে এবং ভ্যাট, আয়কর ও অন্যান্য প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে হবে। মেটা (ফেসবুক) বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণে আগ্রহী এবং সম্প্রতি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য স্থানীয় পেমেন্ট সুবিধা চালু করেছে, যা ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।

তবে, এই খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ)-এর ২০২৬ সালের বিশ্ব গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫২তম স্থানে নেমে এসেছে, যা গত বছরের চেয়ে ৩ ধাপ পিছিয়ে। ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত ১১৯ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৮ জন পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে আক্রান্ত হন। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির খবর প্রকাশের জন্য ২০২১ সালে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়েছিল। এছাড়া, দেশের সামগ্রিক দুর্নীতি পরিস্থিতি, যেমন বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার দাবি এবং অর্থ পাচারের ঘটনা এই খাতগুলোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এমনকি পাঠ্যপুস্তক ছাপানোর দরপত্রে অনিয়মের সাম্প্রতিক অভিযোগও সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সুপারিশ: মিডিয়া, ওটিটি ও বিজ্ঞাপন খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে একটি স্বাধীন তদারকি সংস্থা গঠন করা অপরিহার্য। এই সংস্থা গণমাধ্যমের তালিকাভুক্তি, সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন, ওটিটি কনটেন্ট মনিটরিং এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। একই সাথে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা উচিত। ডিজিটাল বিজ্ঞাপন নীতিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করে কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে এবং বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোর রাজস্ব ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে গণমাধ্যমকে কালো টাকার প্রভাবমুক্ত করতে হবে এবং প্রকৃত প্রচার সংখ্যার ভিত্তিতে সরকারি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: তন্বী আহমেদ

তন্বী আহমেদ, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: মিডিয়া, ওটিটি ও বিজ্ঞাপন বাজেট।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator