নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাণপ্রবাহ আজ এক গভীর সংকটের মুখে। ভূমিদস্যুতা, নদী দখল, অবৈধ বালু উত্তোলন সিন্ডিকেট এবং পরিবেশ দূষণ – এই ত্রিমুখী আক্রমণে দেশের নদ-নদীগুলো অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। সরকারি সংস্থাগুলোর দুর্বলতা ও দুর্নীতির কারণে এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে, যা দেশের পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ১ হাজার ৪১৫টি নদ-নদী রয়েছে, যার মধ্যে ২১ হাজার ৯৮৮ জন অবৈধ দখলদার চিহ্নিত হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক দখলদার ও তাদের পৃষ্ঠপোষক সিন্ডিকেটগুলোর আগ্রাসন দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।
নদী দখলের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও, প্রভাবশালী মহলের বাধার মুখে তা প্রায়শই ব্যাহত হচ্ছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ তারিখে ঢাকার কেরানীগঞ্জে সিংহ নদী দখলমুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসন দিনব্যাপী অভিযান পরিচালনা করে এবং বেশ কয়েকটি স্থাপনা উচ্ছেদ করে। তবে, দখলদারদের আরও সাত দিনের সময় দেওয়া হয়েছে স্থাপনা সরানোর জন্য। এর আগে, কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর তীরে অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযানেও বাধা ও হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে বিক্ষোভকারীদের হামলায় একজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং চারজনকে আটক করা হয়। গত ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে শুরু হওয়া এই অভিযানে দুই শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের লক্ষ্য থাকলেও, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের বাধার মুখে তা বারবার চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। এমনকি, ৬০০ হেক্টর প্যারাবন উজাড় করে নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের মহোৎসব চলছে, যা পরিবেশের জন্য এক অশনি সংকেত। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি), যা ২০১৩ সালের জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন অনুযায়ী গঠিত হয়েছিল, তাদের কার্যাবলী সমন্বয় ও অবৈধ দখলমুক্ত করার সুপারিশ করার কথা থাকলেও, বর্তমানে এটি কার্যত অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পদ শূন্য থাকায় এবং বিগত সময়ে দখলদারদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে না পারায় এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নদী দখলের পাশাপাশি অবৈধ বালু উত্তোলন সিন্ডিকেট দেশের নদীগুলোকে গ্রাস করছে। সংবাদমাধ্যমে প্রায়শই দেখা যায়, সরকারিভাবে বালুমহাল না থাকলেও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদারদের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেট অবাধে বালু উত্তোলন করছে। উদাহরণস্বরূপ, ভোলার তেঁতুলিয়া নদীতে চার প্রভাবশালী ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে, যা প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং জনভোগান্তি বাড়াচ্ছে। রাজবাড়ী জেলার পদ্মা ও গড়াই নদী থেকেও নামমাত্র ইজারা মূল্যে বালুমহাল দখল করে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রভাবশালী মহল। এতে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং নদীভাঙন, রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়া, নদীর গতিপথের পরিবর্তনসহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে। সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীতেও ইজারার নির্ধারিত সীমানার বাইরে অবাধে বালু ও পাথর তোলা হচ্ছে, যা স্থানীয় প্রকৃতি ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করছে। বালুমহাল ইজারার ক্ষেত্রে শর্ত লঙ্ঘন এবং যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়াই ইজারা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি, পদ্মার রানীনগর বালুমহালের ইজারাদার সাড়ে ১১ কোটি টাকা পরিশোধ করেও সন্ত্রাসীদের দখলের কারণে এক ছটাক বালুও উত্তোলন করতে পারেননি। এই সিন্ডিকেটগুলো এতটাই শক্তিশালী যে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনও হিমশিম খাচ্ছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা, পরিবেশ অধিদপ্তর (ডিওই), নিজেই দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। টিআইবি'র গবেষণা অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরের একশ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীর কারণে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে ৬৬ শতাংশ শিল্পকারখানাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়, যার পরিমাণ ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৯ হাজার টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ১ লাখ ৬৬ হাজার টাকা পর্যন্তও পৌঁছায়। এমনকি, আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপনের আইনি বিধান না থাকলেও ৭২ শতাংশ কারখানার অবস্থান আবাসিক এলাকায়। ৫৭ শতাংশ কারখানা পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ইএমপি) ছাড়াই পরিবেশ ছাড়পত্র পেয়েছে। পরিবেশ দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে অধিদপ্তরের কর্মীদের একাংশের যোগসাজশ রয়েছে, যার ফলে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানটি বিপরীতমুখী ভূমিকা পালন করছে। দুদকও পরিবেশ অধিদপ্তরের দুর্নীতির পাঁচটি প্রধান উৎস চিহ্নিত করেছে। এই দুর্নীতির কারণে দূষণকারী কারখানাগুলো সহজেই অনুমোদন পাচ্ছে, যা নদী, বায়ু ও মাটির দূষণ বাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
নদী দখল ও পরিবেশ দূষণ রোধে সরকার কিছু আইন প্রণয়ন করলেও, সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগের অভাব প্রকট। ২০১৩ সালের জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন এবং প্রস্তাবিত 'ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন' (২০২৩/২০২৬) যেখানে অবৈধ ভূমি দখলকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত নদী ও একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রেখে যেতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং গৃহীত পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে, আইনের দুর্বলতা, আমলা-নির্ভরতা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং পেশাগত দক্ষতার ঘাটতি পরিবেশ অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে তুলছে। জনসচেতনতার অভাবও নদী রক্ষা কার্যক্রমে একটি বড় বাধা। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নদী রক্ষা কমিশন, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ অধিদপ্তর এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
সুপারিশ: দেশের নদ-নদী ও পরিবেশ রক্ষায় অবিলম্বে নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত: প্রথমত, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সংস্থায় রূপান্তরিত করতে হবে, যার চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হবে এবং তাদের মেয়াদকাল নিশ্চিত করা হবে। কমিশনের শূন্য পদগুলো অবিলম্বে পূরণ করে এর কার্যকারিতা বাড়াতে হবে এবং তাদের সরাসরি তদন্ত ও আইন প্রয়োগের ক্ষমতা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। টিআইবি ও দুদকের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদানে স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তৃতীয়ত, অবৈধ বালু উত্তোলন সিন্ডিকেটগুলোকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। বালুমহাল ইজারা প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ডিজিটাল করতে হবে এবং ইজারার শর্তাবলী কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) ছাড়া কোনো বালুমহাল ইজারা দেওয়া যাবে না এবং অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে। চতুর্থত, নদী দখলকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে প্রস্তাবিত আইনগুলো দ্রুত পাস ও কার্যকর করতে হবে এবং নদী আদালত প্রতিষ্ঠা করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, নদী রক্ষা ও পরিবেশ দূষণ রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।