জলবায়ু অর্থায়ন: আন্তর্জাতিক সংস্থার 'সবুজ ঋণ' ও বাংলাদেশের অপ্রাপ্তি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু অর্থায়ন: আন্তর্জাতিক সংস্থার 'সবুজ ঋণ' ও বাংলাদেশের অপ্রাপ্তি

মাহফুজার রহমান  avatar   
মাহফুজার রহমান
জলবায়ু অর্থায়ন: আন্তর্জাতিক সংস্থার 'সবুজ ঋণ' ও বাংলাদেশের অপ্রাপ্তি
জলবায়ু অর্থায়ন: আন্তর্জাতিক সংস্থার 'সবুজ ঋণ' ও বাংলাদেশের অপ্রাপ্তি
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক তার ২০২৫ সালের সবুজ ঋণ পোর্টফোলিওতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু সহনশীলতা প্রকল্...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক তার ২০২৫ সালের সবুজ ঋণ পোর্টফোলিওতে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু সহনশীলতা প্রকল্পে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর আন্তর্জাতিক সংস্থার 'সবুজ ঋণ' প্রাপ্তি এবং তার কার্যকর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অর্থায়ন একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হলেও, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব প্রাপ্তির মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়ে গেছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমন প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

জলবায়ু অর্থায়ন, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংস্থার 'সবুজ ঋণ', বর্তমানে বৈশ্বিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), এবং গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমবর্ধমান হারে জলবায়ু-বান্ধব প্রকল্পগুলিতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই ঋণগুলো সাধারণত প্রচলিত ঋণের চেয়ে কম সুদে এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিশোধের সুবিধাসহ আসে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এই ঋণ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া প্রায়শই জটিল এবং শর্তসাপেক্ষ হয়। প্রকল্প প্রস্তাবনার গুণগত মান, কারিগরি সক্ষমতা, এবং পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা মানদণ্ড পূরণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো, যেখানে প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এই শর্তগুলো পূরণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক সবুজ ঋণের এই জটিল কাঠামোগত শর্তাবলী এবং তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রকল্প প্রণয়নের অক্ষমতা প্রায়শই বাংলাদেশকে এই অর্থায়নের পূর্ণ সুবিধা নিতে বাধা দিচ্ছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে, আন্তর্জাতিক সবুজ ঋণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক ফোরামে জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা, দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে যোগাযোগ স্থাপনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক দক্ষতা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নিরবচ্ছিন্ন ও প্রশংসনীয় অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তি তৈরি করেছে, যা জলবায়ু অর্থায়নসহ অন্যান্য বৈশ্বিক ইস্যুতে আলোচনার সময় একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। এই কূটনৈতিক পুঁজিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ জি৭, জি২০ এবং অন্যান্য জলবায়ু ফোরামে উন্নত দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে যাতে সবুজ ঋণ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও অনুকূল হয়। তবে, প্রায়শই দেখা যায় যে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে প্রযুক্তিগত ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলোর সাথে সমন্বয় করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিগুলো জাতীয় বাস্তবতায় রূপান্তর হতে বিলম্বিত হয়।

আঞ্চলিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মগুলো, যেমন বিমসটেক (BIMSTEC) এবং সার্ক (SAARC), জলবায়ু পরিবর্তনের মতো আন্তঃসীমান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যদিও এই সংস্থাগুলো সরাসরি অর্থায়নকারী নয়, তবে তারা যৌথ প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আঞ্চলিক জলবায়ু ঝুঁকি প্রশমনে সম্মিলিত কৌশল প্রণয়নের জন্য একটি মঞ্চ প্রদান করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই আঞ্চলিক ফোরামগুলোতে জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের জন্য যৌথ প্রস্তাবনা তৈরিতে নেতৃত্ব দিতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোর কাছে আরও আকর্ষণীয় হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সার্কের সদস্য দেশগুলো যৌথভাবে জলবায়ু স্থিতিস্থাপক কৃষি বা আঞ্চলিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক সবুজ ঋণ চাইতে পারে, যা এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে কঠিন হতে পারে। কিন্তু, এই আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকারিতা প্রায়শই রাজনৈতিক মতানৈক্য এবং সমন্বয়হীনতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, যার ফলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো আন্তর্জাতিক সবুজ ঋণের সম্ভাব্য আঞ্চলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।

অর্থায়নকারী সংস্থা প্রতিশ্রুত সবুজ ঋণের পরিমাণ (২০২১-২০২৩, মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিতরণকৃত সবুজ ঋণের পরিমাণ (২০২১-২০২৩, মিলিয়ন মার্কিন ডলার) বিতরণ হার (%)
বিশ্বব্যাংক (IBRD/IDA) ১২৫০ ৭৫০ ৬০%
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ৯০০ ৪৫০ ৫০%
গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) ৩০০ ১০০ ৩৩%
ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (EIB) ২০০ ৮০ ৪০%

উৎস: বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থাগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন (প্রাপ্য তথ্যভিত্তিক অনুমান)

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী 'জলবায়ু অর্থায়ন কূটনীতি ইউনিট' গঠন করা, যা আন্তর্জাতিক সবুজ ঋণ সংস্থাগুলোর শর্তাবলী এবং প্রক্রিয়াগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং বাংলাদেশের জন্য সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়ন করবে। এই ইউনিটকে জাতীয় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সাথে নিয়মিত সমন্বয় করতে হবে যাতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়।
  • জাতীয় প্রকল্প প্রস্তুতি তহবিল (National Project Preparation Fund) প্রতিষ্ঠা করা, যা জলবায়ু-বান্ধব প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং বিস্তারিত নকশা প্রণয়নে কারিগরি সহায়তা দেবে। এই তহবিলকে 'জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন, ২০১০' এর আওতায় শক্তিশালী করা যেতে পারে এবং এর মাধ্যমে দক্ষ পরামর্শক নিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
  • এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলির সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা জোরদার করে 'নীতি-ভিত্তিক ঋণ' (Policy-Based Lending) এর আওতায় জলবায়ু সহনশীলতা নীতি সংস্কারের জন্য সবুজ ঋণ প্রাপ্তির সুযোগ অন্বেষণ করা। এর পাশাপাশি, বিমসটেক এবং সার্কের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে জলবায়ু-সম্পর্কিত যৌথ প্রকল্প প্রস্তাবনা এবং আঞ্চলিক কৌশল প্রণয়নে সক্রিয় নেতৃত্ব প্রদান করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহফুজার রহমান

মাহফুজার রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator