অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

জাবীর হোসেন  avatar   
জাবীর হোসেন
অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন দেশের বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত দ...

সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন দেশের বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত দশ বছরে দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষ করে সুন্দরবনের সংলগ্ন এলাকা এবং উত্তরবঙ্গের শালবনভূমি, কৃষি সম্প্রসারণ ও অবৈধ দখলের শিকার হয়েছে। শুধু তাই নয়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে অনেক বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে, যা পরিবেশবিদদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল প্রাকৃতিক ভারসাম্যের জন্য হুমকি নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয় সক্ষমতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

এই অবক্ষয়ের মূলে রয়েছে বহুবিধ কারণ, যার মধ্যে অন্যতম হলো সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করে স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভের উপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) প্রায়শই কৃষকদের উচ্চ ফলনশীল একক শস্য চাষে উৎসাহিত করে, যা ঐতিহ্যবাহী মিশ্র কৃষি পদ্ধতির বিলুপ্তি ঘটাচ্ছে। এই একক শস্য চাষ পদ্ধতির কারণে মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে, রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়ছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, বনভূমি উজাড় করে বা বনের কাছাকাছি এলাকায় ধান, ভুট্টা বা তামাকের মতো বাণিজ্যিক শস্যের চাষ প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো উদ্ভিদ প্রজাতি এবং তাদের উপর নির্ভরশীল কীটপতঙ্গ ও প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলকে ব্যাহত করছে। এর ফলে পরাগায়নের জন্য অপরিহার্য মৌমাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের সংখ্যা কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া, শিল্পায়ন ও নগরায়নের চাপ বনাঞ্চল এবং জলাভূমিকে সংকুচিত করছে, যা বন্যপ্রাণীর বিচরণের স্থান কমিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।

কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) মূলত খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন জাত উদ্ভাবনের উপর জোর দিয়ে থাকে। যদিও এই প্রচেষ্টা খাদ্য নিরাপত্তায় অবদান রাখে, তবে প্রায়শই পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। BARC-এর সমন্বিত গবেষণা পরিকল্পনায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে একটি মূল উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা থাকলেও, বাস্তবে এর প্রতিফলন খুবই সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, BRRI উদ্ভাবিত ধানের উচ্চ ফলনশীল জাতগুলো স্থানীয়, ঐতিহ্যবাহী ধানের জাতগুলোকে প্রতিস্থাপিত করছে, যা হাজার বছরের সঞ্চিত জেনেটিক বৈচিত্র্যকে ধ্বংস করছে। BARI-এর অধীনে বিভিন্ন ফসলের জাত উন্নয়ন কর্মসূচিতেও পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়ন এবং জীববৈচিত্র্য-বান্ধব কৃষি পদ্ধতির প্রচারে যথেষ্ট জোর দেওয়া হয় না। এর ফলে, একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দেখা যেত এমন অনেক স্থানীয় ফল, সবজি ও শস্যের জাত এখন বিলুপ্তির পথে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধুমাত্র উৎপাদনমুখী না হয়ে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সাথে সমন্বয় করে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যাতে কৃষিক্ষেত্রে উদ্ভাবন পরিবেশের উপর বোঝা না হয়ে প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার অংশ হয়। পাশাপাশি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২ এবং বন আইন, ১৯২৭-এর দুর্বল প্রয়োগ এবং বন বিভাগের সীমিত জনবল ও প্রযুক্তির অভাব অবৈধ বন উজাড় এবং বন্যপ্রাণী পাচার রোধে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। বন-নির্ভর জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান এবং তাদের জীবনযাপন পদ্ধতিকে প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়। যখন তাদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ সীমিত থাকে, তখন তারা বনজ সম্পদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তোলে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার কারণে বনভূমি এবং কৃষিজমির সীমানা নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়, যা অবৈধ দখলদারিত্বকে উৎসাহিত করে। সর্বোপরি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি দেশের উপকূলীয় বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি সমন্বিত, বহু-সংস্থাভিত্তিক এবং বিজ্ঞানভিত্তিক কৌশল অপরিহার্য, যেখানে প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজ নিজ দায়িত্বের বাইরেও বৃহত্তর পরিবেশগত প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করবে।

সূচক ২০১০ ২০২০ পরিবর্তন (শতাংশ)
মোট বনভূমি (শতাংশ) ১৭.৬% ১৪.১% -৩.৫%
সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ দখলের হার ১২.২% ১৯.৫% +৭.৩%
বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বাজেট (মোট বাজেটের অংশ) ০.০৮% ০.০৫% -০.০৩%
সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ঘনত্ব হ্রাস -১.০% -২.৫% -১.৫%

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগ, বাংলাদেশ (নির্বাচিত অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন)

সুপারিশ

  • বন আইন, ১৯২৭ (এবং এর সংশোধনীসমূহ) এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২-এর কঠোর ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বন বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন স্যাটেলাইট মনিটরিং, ড্রোন) এবং পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে একটি বিশেষ পরিবেশ আদালত গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে, যা বন ও বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে।
  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-কে তাদের কার্যক্রমের কেন্দ্রে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নতুন শস্য জাত উদ্ভাবন এবং কৃষি সম্প্রসারণ কর্মসূচির পূর্বে বাধ্যতামূলকভাবে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (EIA) পরিচালনা করতে হবে। DAE-কে জৈব কৃষি, মিশ্র কৃষি, এবং স্থানীয় জাতের শস্য চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে। BARC-কে আন্তঃ-প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় জীববৈচিত্র্য-বান্ধব কৃষি প্রযুক্তির উপর জোর দিতে হবে।
  • একটি সমন্বিত 'জাতীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কৌশল' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, DAE, BARI, BRRI, BARC এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে। এই কৌশলের আওতায়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে হবে এবং তাদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে তারা বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বন সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। একটি 'জাতীয় জীববৈচিত্র্য তহবিল' গঠন করে সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাবীর হোসেন

জাবীর হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator