তিন দশকের শিক্ষকতা শেষে বিদায় অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তিন দশকের শিক্ষকতা শেষে বিদায় অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম

Sabir Khan avatar   
Sabir Khan
তিন দশকের শিক্ষকতা শেষে বিদায় অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম
তিন দশকের শিক্ষকতা শেষে বিদায় অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত
বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে ২৪ সেপ্টেম্বর শেষ কর্মদিবস

ছাবির খাঁন, সিলেট :

শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়—এটি মানুষ গড়ার দীর্ঘ সাধনা। শ্রেণিকক্ষের পাঠ একসময় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একজন শিক্ষকের জ্ঞান, আদর্শ ও প্রভাব শিক্ষার্থীদের জীবন ও কর্মে থেকে যায় দীর্ঘদিন। প্রায় তিন দশকের এমনই এক সমৃদ্ধ শিক্ষকতা জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছেন বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মোঃ তারিকুল ইসলাম। আগামীকাল ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তাঁর চাকরিজীবনের শেষ কর্মদিবস।

প্রায় ৩০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি কখনো শ্রেণিকক্ষে জ্ঞান বিতরণ করেছেন, আবার কখনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রভাষক থেকে অধ্যাপক এবং শিক্ষকতা থেকে উপাধ্যক্ষ—বিভিন্ন দায়িত্বের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন।

বিয়ানীবাজার কলেজেই কর্মজীবনের বড় অধ্যায়

১৯৯৬ সালের ১০ আগস্ট বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের প্রভাষক হিসেবে অধ্যাপক মোঃ তারিকুল ইসলামের শিক্ষকতা জীবনের সূচনা। অল্প সময়ের জন্য সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালনের পর ২০০৪ সালের আগস্টে তিনি আবারও বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজে ফিরে আসেন।

এরপর এই কলেজই হয়ে ওঠে তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম প্রধান ঠিকানা। দীর্ঘ সময়ে তিনি প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পাঠদানের পাশাপাশি তাঁদের উচ্চশিক্ষা, পেশাজীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছেন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করেছেন দক্ষতার সঙ্গে। উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় কলেজের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সমন্বয়, শৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখেন তিনি।

কর্মজীবনের একটি পর্যায়ে তিনি বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০ জুলাই ২০২৩ আবারও বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ হিসেবে ফিরে আসেন। আগামীকাল সেই প্রতিষ্ঠানেই শেষ হবে তাঁর দীর্ঘ চাকরিজীবনের আনুষ্ঠানিক অধ্যায়।

শিক্ষাজীবন ও ব্যক্তিজীবন

অধ্যাপক মোঃ তারিকুল ইসলাম ১৯৬৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৩ সালে এসএসসি এবং ১৯৮৫ সালে এইচএসসি পাস করার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স (১৯৮৮) ও মাস্টার্স (১৯৮৯) সম্পন্ন করেন।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি একটি শিক্ষিত ও কর্মমুখী পরিবারের অভিভাবক। তাঁর স্ত্রী ফাতিমা নাসরিন বি.কম পাস এবং খসির হাজী সাইদ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাঁর ছেলে নাবিদ সালেহীন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর রাসায়ন প্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। মেয়ে তানজিন হুমায়রা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স করছেন। ছোট মেয়ে তাসনিম জুবাইদা পঞ্চখণ্ড সরকারি হরগোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

বিদায়বেলায় ফিরে দেখা

শেষ কর্মদিবসের প্রাক্কালে নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অধ্যাপক মোঃ তারিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় তিন দশকের শিক্ষকতা জীবনের শেষ কর্মদিবসে এসে তাঁর মনে হচ্ছে জীবনের একটি দীর্ঘ ও প্রিয় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, “শিক্ষকতা আমার কাছে কখনো শুধু চাকরি ছিল না; এটি ছিল মানুষ গড়ার এবং একটি প্রজন্মকে জ্ঞান ও স্বপ্নের পথে এগিয়ে দেওয়ার সুযোগ।”

বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুধু কর্মক্ষেত্রের নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠান তাঁর জীবনের একটি বড় অংশের স্মৃতি ধারণ করে আছে। শিক্ষার্থী, সহকর্মী ও কর্মচারীদের ভালোবাসা ও সহযোগিতা তাঁর পথচলার বড় শক্তি ছিল।

অবসর জীবনেও শিক্ষা ও সমাজের কল্যাণে যতটুকু সম্ভব ভূমিকা রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

শেষ নয়, নতুন অধ্যায়ের শুরু

চাকরির নিয়মে আগামীকাল শেষ হবে তাঁর কর্মজীবনের একটি অধ্যায়। তবে একজন শিক্ষকের পথচলা কি সত্যিই অবসরে থেমে যায়?

যে শিক্ষার্থীরা তাঁর শ্রেণিকক্ষে বসেছে, যাঁরা সহকর্মী হিসেবে তাঁর পাশে থেকেছেন এবং যে প্রতিষ্ঠানকে তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় দিয়েছেন—তাঁদের স্মৃতিতে তাঁর কর্মজীবনের নানা অধ্যায় থেকে যাবে আরও বহুদিন।

প্রায় ৩০ বছরের শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের পর অধ্যাপক মোঃ তারিকুল ইসলামের এই বিদায় তাই কেবল একটি চাকরির সমাপ্তি নয়; এটি একটি দীর্ঘ শিক্ষকতা অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি। সামনে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে জীবনের নতুন এক অধ্যায়—যেখানে পেশাগত দায়িত্বের ব্যস্ততার পরিবর্তে থাকবে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও সময়কে নতুনভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator