তথ্য অধিকারের স্বপ্ন বনাম ডিজিটাল সুরক্ষার বাস্তবতা: গণমাধ্যমের টানাপোড়েন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তথ্য অধিকারের স্বপ্ন বনাম ডিজিটাল সুরক্ষার বাস্তবতা: গণমাধ্যমের টানাপোড়েন

সাইফুল বারী  avatar   
সাইফুল বারী
তথ্য অধিকারের স্বপ্ন বনাম ডিজিটাল সুরক্ষার বাস্তবতা: গণমাধ্যমের টানাপোড়েন
তথ্য অধিকারের স্বপ্ন বনাম ডিজিটাল সুরক্ষার বাস্তবতা: গণমাধ্যমের টানাপোড়েন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-কে প্রতিস্থাপন করে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ প্রণয়নের সরকারি উদ্যোগ গণমাধ্যম মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও সরক...

সম্প্রতি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-কে প্রতিস্থাপন করে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ প্রণয়নের সরকারি উদ্যোগ গণমাধ্যম মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও সরকার এই পদক্ষেপকে ডিজিটাল পরিসরে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার একটি প্রগতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, তবে অনেক গণমাধ্যমকর্মী ও অধিকারকর্মী আশঙ্কা করছেন যে, নতুন আইনটিও তথ্য অধিকারের মৌলিক চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথে নতুন বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশ সরকার তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল সুরক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব নিয়ে গণমাধ্যমের টানাপোড়েন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯, দেশের নাগরিকদের তথ্য জানার সাংবিধানিক অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা, দুর্নীতি হ্রাস করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। শুরুর দিকে, এই আইন গণমাধ্যমকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উন্মোচনে সহায়তা করেছে, যা জনস্বার্থে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। তবে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর প্রবর্তন এবং পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর খসড়া প্রণয়ন তথ্য অধিকার আইনের সেই স্বপ্নকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। বিশেষ করে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘মানহানি’, ‘রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা’ এবং ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো’র মতো অস্পষ্ট ধারাগুলো প্রায়শই গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে, যা তাদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করেছে। ফলস্বরূপ, অনেক সরকারি সংস্থা তথ্য অধিকার আইনে তথ্য প্রদানে অনীহা দেখালে, সাংবাদিকরা সেই তথ্য জনসম্মুখে আনতে দ্বিধাগ্রস্ত হন, কারণ এর সম্ভাব্য আইনি পরিণতি তাদের পেশাগত জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। এই টানাপোড়েন শুধু গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সামগ্রিকভাবে তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা এবং নাগরিক সমাজের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করছে, যা সুশাসনের জন্য অপরিহার্য।

এই আইনের বাস্তব প্রয়োগে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও কাঙ্ক্ষিত তথ্য পাওয়া যায়নি, অথবা তথ্য প্রদানে অযাচিত বিলম্ব করা হয়েছে। যখন কোনো সাংবাদিক এমন তথ্য প্রকাশ করতে চেয়েছেন যা কর্তৃপক্ষের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে, তখন তাদের প্রায়শই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে মামলার সম্মুখীন হতে হয়েছে। World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এবং নীতিগত সংলাপে সবসময়ই সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দিয়ে এসেছে। তারা মনে করে, একটি শক্তিশালী তথ্য অধিকার কাঠামো এবং স্বাধীন গণমাধ্যম দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কঠোর প্রয়োগ এসব নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, যা তাদের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, World Bank-এর 'Worldwide Governance Indicators' (WGI) রিপোর্টে 'Voice and Accountability' এবং 'Control of Corruption' সূচকগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থানের ওপর এই আইনগুলোর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সরকার যদিও স্বচ্ছতার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে, তবে আইনের প্রয়োগে এর প্রতিফলন না থাকায় আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে।

ডিজিটাল সুরক্ষার নামে গণমাধ্যমের উপর যে পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। যখন তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, তখন জনমত গঠন এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হয়। এতে করে সমাজে গুজব ও ভুল তথ্যের বিস্তার ঘটে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এ কিছু ধারা শিথিল করা হলেও, অনেক গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, 'অপরাধ' এর সংজ্ঞা এখনও যথেষ্ট অস্পষ্ট এবং সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিযুক্ত। যেমন, 'মানহানি' সংক্রান্ত ধারাকে জামিনযোগ্য করা হলেও, এর অপব্যবহারের সুযোগ থেকেই যায়। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বৈদেশিক সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, অথবা অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ হতে পারে এমন তথ্য প্রকাশে বাধা থাকলেও, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইন এই বাধাগুলোকে আরও কঠোর ও বিস্তৃত করেছে, যা জনস্বার্থের তথ্য উন্মোচনে সাংবাদিকদের জন্য এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকেই খর্ব করে না, বরং এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং সুশাসনের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়, যা একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২
তথ্য অধিকার আইনে প্রাপ্ত আবেদনের সংখ্যা (আনুমানিক) ১০০০০ ১২৫০০ ১৫০০০
তথ্য প্রদানে ব্যর্থতার বিরুদ্ধে আপিলের সংখ্যা (আনুমানিক) ১০০০ ১২০০ ১৫০০
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নিবন্ধিত মামলার সংখ্যা (সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে, আনুমানিক) ২০০ ২৫০ ৩০০
World Bank-এর 'Voice and Accountability' সূচক (১০০ এর মধ্যে) ৩১.৭ ৩০.৫ ২৯.২

উৎস: তথ্য কমিশন, বাংলাদেশ; বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা; World Bank-এর Worldwide Governance Indicators।

সুপারিশ

  • সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৫ (মিথ্যা বা আপত্তিকর তথ্য প্রকাশ), ২৮ (পরিচয় জালিয়াতি) এবং ২৯ (মানহানি) সুনির্দিষ্টভাবে সংশোধন করে 'সাংবাদিকতা' ও 'জনস্বার্থ' সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে এর আওতামুক্ত রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে এই সংশোধনীগুলো দ্রুত কার্যকর করতে হবে, যাতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য হয়রানি এড়ানো যায়।
  • তথ্য অধিকার কমিশনকে (Information Commission) আরও শক্তিশালী করতে হবে। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর ধারা ২৪(৪) অনুযায়ী কমিশনের সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক হলেও, এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কমিশনকে আরও জনবল ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে এর তদারকি ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং তথ্য প্রদানে ব্যর্থতার বিরুদ্ধে আপিলের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ ও প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, গণমাধ্যমকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিচারকদের জন্য তথ্য অধিকার আইন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়ক নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করবে। এর মাধ্যমে তথ্য অধিকার আইনের মূল চেতনা এবং ডিজিটাল সুরক্ষা আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার বিশেষ দিকগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, যা আইনের অপব্যবহার রোধে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাইফুল বারী

সাইফুল বারী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator