ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি… | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতে ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন এবং আর্থিক প্রতারণার অসংখ্য অভিযোগ যখন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) এর দপ্তরে ...

সাম্প্রতিক সময়ে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতে ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন এবং আর্থিক প্রতারণার অসংখ্য অভিযোগ যখন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) এর দপ্তরে পাহাড় সমান অভিযোগের স্তূপ তৈরি করেছে, তখন এটি কেবল কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা ভুল হবে। বরং, এটি একটি গভীরতর কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতি প্রণেতাদের দূরদৃষ্টির অভাবকেই নির্দেশ করে। ইভ্যালি, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা শপিং-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর পতন এবং তাদের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ শুধু হাজার হাজার গ্রাহককে পথে বসায়নি, বরং সম্ভাবনাময় ডিজিটাল অর্থনীতির উপর সাধারণ মানুষের আস্থাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্টতই প্রশ্ন তোলে: আমাদের নীতি প্রণেতারা কি এই খাতের দ্রুত বিকাশ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন, নাকি বিদ্যমান সিস্টেমই এই ধরনের নৈরাজ্য মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না?

ডিজিটাল অর্থনীতির এই উত্থানকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শুরুতে যথেষ্ট ইতিবাচক ছিল। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রিতা দেখা গেছে। যখন ই-কমার্স খাত দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তখন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি পূর্ণাঙ্গ ও যুগোপযোগী ডিজিটাল কমার্স আইন প্রণয়নের পরিবর্তে কেবলমাত্র 'ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা' (Digital Commerce Operating Guideline) জারি করে দায় সারার চেষ্টা করে। এই নির্দেশিকাটি আইনি বাধ্যবাধকতার দিক থেকে যথেষ্ট দুর্বল ছিল এবং এর লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। ফলস্বরূপ, অনেক অসাধু ব্যবসায়ী এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চটকদার অফার এবং অস্বাভাবিক ডিসকাউন্ট দিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে তাদের অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ পায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এই খাতের লেনদেন থেকে ভ্যাট ও আয়কর সংগ্রহে কার্যকর পদ্ধতি প্রণয়নেও পিছিয়ে ছিল, যার ফলে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে এবং অস্বচ্ছ লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।

সিস্টেমের দুর্বলতা কেবল আইন প্রণয়নের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বিদ্যমান আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির সক্ষমতার অভাবও প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে আর্থিক অপরাধ তদন্ত এবং সাইবার জালিয়াতি শনাক্তকরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও মানবসম্পদ উভয় ক্ষেত্রেই ঘাটতি ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SMEs) জন্য এফ-কমার্স একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হলেও, এই প্ল্যাটফর্মগুলোতে লেনদেনের স্বচ্ছতা এবং বিক্রেতাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেস বা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ছিল না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার ই-কমার্স খাতের ঝুঁকি এবং একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সতর্ক করে আসছিল। তাদের বিভিন্ন গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিয়ন্ত্রক শূন্যতার কারণে শুধু গ্রাহকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হননি, বরং বৈধ ডিজিটাল ব্যবসাগুলোও একটি অবিশ্বাসের পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হয়েছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ আকর্ষণকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই সমস্যার মূল কারণ হলো বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং একটি একক, শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ না থাকা যা ডিজিটাল কমার্স সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় তদারকি করতে পারে।

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পণ্য রপ্তানির যে বিশাল সম্ভাবনা ছিল, সেটিকেও ম্লান করে দিয়েছে। যখন স্থানীয় বাজারে ডিজিটাল লেনদেনের উপর আস্থা কমে যায়, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যবসার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যদিও সরাসরি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর নিয়ন্ত্রক নয়, তবে একটি স্থিতিশীল ও আস্থাবান বাজার পরিবেশ সামগ্রিকভাবে পুঁজি বিনিয়োগের জন্য অপরিহার্য। যখন একটি খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও প্রতারণা হয়, তখন তা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে এবং উদ্যোক্তাদের জন্য পুঁজি সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যাগুলো কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথে একটি বড় বাধা। ডিজিটাল অর্থনীতির পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে, নীতি প্রণেতাদের অবশ্যই তাদের ব্যর্থতা স্বীকার করে এবং সিস্টেমের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত ও কার্যকর সমাধান নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

ডিজিটাল কমার্স খাতের কিছু পরিসংখ্যান এবং অভিযোগের চিত্র
সাল ই-কমার্স বাজারের আকার (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর-এ ই-কমার্স সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক ই-কমার্স খাত থেকে আদায়কৃত ভ্যাট (কোটি টাকা)
২০১৮ ১.১ ১,২০০ ৩৫
২০১৯ ১.৬ ২,৫০০ ৫০
২০২০ ২.০ ৭,৮০০ ৮০
২০২১ ২.৫ ১৫,২০০ ১২০
২০২২ ২.৮ ১০,৫০০ ১৮০

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (আনুমানিক তথ্য)।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী 'ডিজিটাল কমার্স নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা 'ডিজিটাল কমার্স আইন, ২০২৫' (প্রস্তাবিত) এর অধীনে ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল কার্যক্রম তদারকি, লাইসেন্সিং, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রাখবে। এই কর্তৃপক্ষকে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সমন্বিত কার্যনির্বাহী পরিষদ গঠন করতে হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলির জন্য একটি বাধ্যতামূলক, স্বয়ংক্রিয় এবং স্বচ্ছ ভ্যাট/ট্যাক্স সংগ্রহ পদ্ধতি চালু করতে হবে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক-এর পেমেন্ট গেটওয়ের সাথে সরাসরি সমন্বিত হবে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি লেনদেনের উপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্যাট কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সরলীকৃত বার্ষিক ট্যাক্স রিটার্ন প্রক্রিয়া প্রবর্তন করতে হবে।
  • জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (DNCRP) এর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করতে হবে এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার অপরাধ তদন্তে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলির জন্য একটি বাধ্যতামূলক 'কাস্টমার ট্রাস্ট ফান্ড' গঠনের নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে ব্যবহৃত হবে এবং এর তহবিল বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পরিচালিত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator