গত একুশ সেপ্টেম্বর রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে প্রকাশিত এক নীতিগত বিবৃতিতে দেশের জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান সরকারের নজিরবিহীন অদক্ষতা এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে দেশের ১৮ কোটি সাধারণ মানুষকে। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এটি জ্বালানি তেলের তৃতীয় দফা মূল্যবৃদ্ধি, যা দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। কোনো ধরনের কার্যকর ও সৃজনশীল বিকল্প সমাধানের পথে না হেঁটে সরকার সরাসরি জনগণের ওপর অসহনীয় আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর ফলে সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। সরকারের এই একরোখা সিদ্ধান্তের কারণে মুদ্রাস্ফীতি বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। অথচ সংকট উত্তরণে জনগণের পকেট কাটার পরিবর্তে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক মহলের উচিত ছিল আরও দূরদর্শী ও জনবান্ধব অর্থনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা, যা এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর এই হঠকারী সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক উৎপাদন খাত, কৃষি এবং যাতায়াত ব্যবস্থাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। রাষ্ট্র যখন নিজেই সংকটের দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়, তখন জনগণের মৌলিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়, যা এই সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনায় অত্যন্ত নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছে, আর তাই এই মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য ছিল। কিন্তু এই যুক্তির গভীর কোনো ভিত্তি নেই কারণ সরকার জ্বালানি তেল আমদানির ওপর এখনো ৩২ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের উচ্চহারের কর ও শুল্ক আদায় করে চলেছে। নাহিদ ইসলাম তার সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণে প্রশ্ন তুলেছেন যে, বর্তমান জাতীয় সংকটের মুহূর্তে নাগরিকদের ওপর থেকে জীবনযাত্রার এই বাড়তি চাপ কমাতে সরকার কেন ন্যূনতম সাময়িক সময়ের জন্যও এসব কর ও শুল্ক কমানোর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করছে না। একদিকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার ভরা রাখতে উচ্চ হারে শুল্ক আদায় করা হবে এবং অন্যদিকে বিপিসির লোকসানের অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর দফায় দফায় তেলের দাম বাড়ানো হবে—এই দ্বিমুখী নীতি সম্পূর্ণ অমানবিক ও জনস্বার্থবিরোধী। সরকারের এই অদূরদর্শী পদক্ষেপের কারণে পরিবহন মালিক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা পর্যন্ত সবাই এক অবর্ণনীয় চক্রব্যূহের মধ্যে পড়েছেন, যেখানে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঊর্ধ্বমুখী। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা দিয়ে রাষ্ট্রীয় খাতের অদক্ষতা ঢাকবার এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, তখন জ্বালানির মতো একটি সংবেদনশীল খাতের পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টা কেবল জনরোষকেই বাড়িয়ে তুলছে এবং সমাজে এক ধরনের তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করছে। কর ও শুল্কের বোঝা কমিয়ে যদি জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখা যেত, তবে এই সংকটময় পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব ছিল, যা বর্তমান প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার কারণে আজ বাস্তবায়িত হয়নি।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে মূলত বছরজুড়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, কিন্তু সমান্তরালভাবে অন্য খাতের ব্যয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংকোচন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত ৪৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ও অযৌক্তিক। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার তীব্র চাপের মুখে যেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখা প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, সেখানে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নকে কেন এতখানি জরুরি করা হলো, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংকটের যুক্তি দেখিয়ে যদি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রার ওপর একের পর এক বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে রাষ্ট্রের অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল ব্যয়গুলো পুনর্বিন্যাস করে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া কেন সম্ভব হবে না—এই মৌলিক প্রশ্নটি আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নতুন পে স্কেল স্থগিত রাখার দাবি জানিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ প্রশাসনের ভেতরে থাকা অতিরিক্ত ও অনুৎপাদনশীল ব্যয়গুলো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের তাগিদ দিয়েছেন। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের এই বৈষম্যমূলক নীতি পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল থেকে বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এই ধরনের একপেশে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি চলতে থাকলে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চিরতরে বিনষ্ট হবে এবং সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলবে, যা সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য এক বড় হুমকি স্বরূপ।
জ্বালানি তেলের এই অযৌক্তিক ও নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার না করা হলে দেশের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে সাথে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির এই দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের প্রতিটি খাতের ওপর, যার ফলে মুদ্রাস্ফীতির পারদ অনিয়ন্ত্রিতভাবে উপরে উঠে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। যাতায়াত খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে প্রতিটি শিল্প পণ্যের উৎপাদনে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতার ওপরই সবচেয়ে বড় আঘাত হানছে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে বিকল্প উপায়ে রাজস্ব সংগ্রহ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। জনগণের ওপর নতুন করে কোনো ধরনের বাড়তি বোঝা না চাপিয়ে রাষ্ট্রীয় তহবিলের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতি দমনের মাধ্যমেই কেবল বর্তমান এই জ্বালানি সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব। অন্যথায়, এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত দেশের জনমিতি ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করবে, যার দায় সম্পূর্ণভাবেই অদক্ষ ও অপরিকল্পিত নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার ওপর বর্তাবে। সময় থাকতেই যদি সঠিক ও জনবান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা না হয়, তবে এই জ্বালানি সংকট দেশের সামগ্রিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করবে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।