টেলিকম খাতের গভীরে দুর্নীতি: বিটিআরসির পদক্ষেপ ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

টেলিকম খাতের গভীরে দুর্নীতি: বিটিআরসির পদক্ষেপ ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন

নাদিয়া ইসলাম  avatar   
নাদিয়া ইসলাম
টেলিকম খাতের গভীরে দুর্নীতি: বিটিআরসির পদক্ষেপ ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন
টেলিকম খাতের গভীরে দুর্নীতি: বিটিআরসির পদক্ষেপ ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল টেলিকম খাত, যা ডিজিটাল বাংলাদেশের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম এবং জবাবদিহিতার অভাবে জর্জরিত। ...

বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল টেলিকম খাত, যা ডিজিটাল বাংলাদেশের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম এবং জবাবদিহিতার অভাবে জর্জরিত। 'আই নিউজ বিডি'-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোবাইল অপারেটরদের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে শুরু করে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, রাজস্ব ফাঁকি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমেও নানা অসঙ্গতি বিদ্যমান। এসব ঘটনা একদিকে যেমন সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি করছে, অন্যদিকে গ্রাহকদেরও প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। টেলিকম খাতের এই অন্ধকার দিকগুলো উদঘাটন করা এবং এর প্রতিকার খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি।

অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা এই খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা। ২০২২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) অবৈধ ভিওআইপি কার্যক্রমে জড়িত থাকার দায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত অপারেটর টেলিটককে ৫ কোটি টাকা, রবিকে ২ কোটি টাকা, গ্রামীণফোনকে ৫০ লাখ টাকা এবং বাংলালিংককে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করে। এই জরিমানা বিটিআরসি পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে জব্দকৃত অবৈধ ভিওআইপিতে ব্যবহৃত সিমের ভিত্তিতে করা হয়েছিল। এর আগেও, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, আইএসপি লাইসেন্স ব্যবহার করে অবৈধ ভিওআইপি পরিচালনার দায়ে আইডিয়া নেটওয়ার্কস অ্যান্ড কমিউনিকেশনস লিমিটেড এবং ডিজিটাল কানেক্টিভিটি লিমিটেড নামের দুটি কোম্পানিকে ২৯ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং ১৯১৩ সালের পিডিআর অ্যাক্ট অনুযায়ী জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রিয়.কম-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর ভিআইপি এলাকায় রেডিওলিংকের মাধ্যমে রমরমা অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা চলছে, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে তিন মাসে (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) সরকারের ৩১৬ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুন মাসে র‍্যাবের অভিযানে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় ব্যবহৃত ৫০ হাজার সিম উদ্ধার করা হয়, যা কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির ইঙ্গিত দেয়। এমনকি ২০২৬ সালের জুলাই মাসে গ্রামীণফোনকে আবারও ১৮.৪০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় অবৈধ কল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার জন্য। এসব ঘটনা টেলিকম খাতে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসার গভীর শিকড় এবং এর বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ের চিত্র তুলে ধরে।

রাজস্ব ফাঁকি এবং গ্রাহক হয়রানিও টেলিকম খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৮ সালের আগস্টে একটি অডিট রিপোর্টে উঠে আসে যে, গ্রামীণফোন ১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সরকারের ১১ হাজার ৫৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকা পাওনা ফাঁকি দিয়েছে। এর মধ্যে বিটিআরসির পাওনা ৭ হাজার ৪৪৪ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট ও ট্যাক্স বাবদ ৪ হাজার ৮৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুন মাসে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জাতীয় সংসদকে জানান যে, দেশের চারটি মোবাইল অপারেটরের কাছে সরকারের মোট ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা রাজস্ব বকেয়া রয়েছে। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের কাছে ৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা, টেলিটকের কাছে ৫ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, রবির কাছে ৬১৫ কোটি টাকা এবং বাংলালিংকের কাছে ৪৭৩ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। গ্রাহক হয়রানির ক্ষেত্রে প্রচারমূলক এসএমএস একটি বড় সমস্যা। ২০২৪ সালের অক্টোবরে বিটিআরসি গ্রামীণফোন, রবি এবং বাংলালিংককে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করে, কারণ তারা 'সেলুলার মোবাইল ফোন অপারেটরসমূহের ডেটা এবং ডেটা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্যাকেজ সম্পর্কিত নির্দেশিকা-২০২৩' লঙ্ঘন করে গ্রাহকদের প্রতিদিন তিনটির বেশি প্রচারমূলক এসএমএস পাঠাচ্ছিল। সিম জালিয়াতি রোধে বিটিআরসি একজন গ্রাহকের জন্য সর্বোচ্চ সিম নিবন্ধনের সংখ্যা ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ করেছে, যা ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। এটি সিম জালিয়াতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমাতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিটিআরসির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, কারণ কমিশন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত পরিচালককে স্বপদে বহাল রেখেছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে টেলিকম খাতের দুর্নীতি নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি ওঠে, যেখানে অভিযোগ করা হয় যে, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতের মতো টেলিকম খাতেও নীরবে লুটপাট চালানো হয়েছে এবং কিছু কোম্পানিকে সব স্তরে লাইসেন্স দিয়ে বাজার প্রতিযোগিতা খর্ব করা হয়েছে। একই সময়ে, সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের বিরুদ্ধে এই খাত থেকে ৫০০ কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি শ্বেতপত্রে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আইসিটি ও টেলিকম খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রকল্পে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করা, অতিরিক্ত ব্যয় ও অস্পষ্ট ব্যবসায়িক পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো উঠে আসে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বিটিআরসি আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন (আইজিডব্লিউ) সংক্রান্ত একটি 'সিন্ডিকেট' ভাঙার সিদ্ধান্ত নেয়, যা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের সাথে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ এবং রাজস্ব ফাঁকির কারণ হয়েছিল। বিটিআরসি এই বিষয়ে তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠিও পাঠায়। এসব ঘটনা বিটিআরসির কার্যকারিতা এবং টেলিকম খাতের সামগ্রিক সুশাসনের ওপর গুরুতর প্রশ্ন তোলে।

টেলিকম খাতের এই অনিয়ম ও দুর্নীতির পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতাও দায়ী। বর্তমানে কার্যকর লাইসেন্স কাঠামো মূলত ২জি/৩জি যুগের জন্য তৈরি, যা ৫জি, আইওটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং ব্লকচেইনের মতো নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারে জটিলতা তৈরি করছে। লাইসেন্স নবায়ন ও সম্প্রসারণে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। এছাড়া, অতিরিক্ত সম্পূরক শুল্ক এবং সিম ট্যাক্স আরোপ টেলিকম শিল্প এবং গ্রাহকদের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে, যা খাতটিকে একটি চ্যালেঞ্জিং সময়ের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের আগস্টে 'বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫'-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়, যা বিটিআরসিকে লাইসেন্স ইস্যু, নবায়ন, হস্তান্তর, স্থগিতকরণ ও বাতিলের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়াই পূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা কমানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। এই পদক্ষেপগুলো টেলিকম খাতের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সুপারিশ: বাংলাদেশের টেলিকম খাতের সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। প্রথমত, বিটিআরসিকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হবে এবং লাইসেন্সিং ও বাজার মূল্যায়নের ক্ষমতা শুধুমাত্র কমিশনের হাতে থাকবে। দ্বিতীয়ত, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা এবং রাজস্ব ফাঁকি রোধে বিটিআরসি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, গ্রাহক সুরক্ষায় বিটিআরসিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, বিশেষ করে প্রচারমূলক এসএমএস এবং লুকানো চার্জের মতো বিষয়ে অপারেটরদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। চতুর্থত, টেলিকম খাতের দুর্নীতির বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত, যেখানে সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকবে এবং জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। পঞ্চমত, 'টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং নীতি, ২০২৫' এর মতো নতুন নীতিমালাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, যা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সহজ করবে এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করবে। একই সাথে, টেলিকম খাতে করের বোঝা যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে হবে, যাতে অপারেটররা বিনিয়োগে উৎসাহিত হয় এবং গ্রাহকদের ওপর চাপ কমে। পরিশেষে, বিটিআরসির নিজস্ব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ অডিট ও তদন্ত প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: নাদিয়া ইসলাম

নাদিয়া ইসলাম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: টেলিকম ও বিটিআরসি (BTRC) ওয়াচ।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator