ফায়ার সার্ভিসে দুর্নীতির আগুন: সেবার আড়ালে অনিয়মের জাল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফায়ার সার্ভিসে দুর্নীতির আগুন: সেবার আড়ালে অনিয়মের জাল

মেহজাবিন আক্তার  avatar   
মেহজাবিন আক্তার
ফায়ার সার্ভিসে দুর্নীতির আগুন: সেবার আড়ালে অনিয়মের জাল
ফায়ার সার্ভিসে দুর্নীতির আগুন: সেবার আড়ালে অনিয়মের জাল
ছবি: সংগৃহীত
দেশের জরুরি সেবার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানুষের জানমাল রক্ষায় কাজ করে। 'সবার আগে সবার পাশে'...

দেশের জরুরি সেবার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর, যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানুষের জানমাল রক্ষায় কাজ করে। 'সবার আগে সবার পাশে' এই অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করা এই সংস্থাটি জনগণের কাছে নির্ভরতার প্রতীক হলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এর অভ্যন্তরে বাসা বাঁধা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পদোন্নতি, বদলি, এমনকি সরঞ্জাম ক্রয়েও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যা এই সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও মিলেছে।

ফায়ার সার্ভিসে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে। বারবার অভিযোগ উঠেছে যে, ফায়ারম্যান নিয়োগে অর্থ লেনদেন ও অনিয়ম একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, একটি চাকরির জন্য ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ চাওয়া হয়। ভাইভার ফলাফল প্রকাশ না করেই গোপনে লোক নিয়োগ সম্পন্ন করার অভিযোগও রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ফায়ার সার্ভিসের এক পরিচালক ও উপ-পরিচালকের বিরুদ্ধে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পরিচালক হাবিবুর রহমান ও উপ-পরিচালক শামীম ৪৩৮ জন ফায়ারম্যানের পরিবর্তে ৮৬৮ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। এছাড়া, গত ১৩ সেপ্টেম্বর (২০২৫) অনুষ্ঠিত ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস, টাকা-পয়সার লেনদেন এবং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। চাকরি প্রত্যাশীরা নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল, মহাপরিচালক জায়েদ কামালের অপসারণ এবং দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, মহাপরিচালক এ অনিয়ম সম্পর্কে অবগত থেকেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না, বরং দ্রুত নিয়োগ সম্পন্ন করার চেষ্টা করছেন। ড্রাইভার ও ফায়ার ফাইটার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে পছন্দের প্রার্থীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং অর্থের বিনিময়ে প্রার্থী নির্বাচনের মতো ঘটনা ঘটে।

নিয়োগ দুর্নীতির পাশাপাশি টেন্ডার, পদোন্নতি, বদলি ও কেনাকাটায়ও পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য এবং কেনাকাটায় অনিয়মসহ নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিযান পরিচালনা করেছে এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতাও পেয়েছে। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের ঘনিষ্ঠ দোসরদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ভয়াবহ সিন্ডিকেট নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যসহ শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যরা, যেমন যুগ্ম সচিব মোজাম্মেল হক (পরিচালক), এডি আনোয়ার হোসেন (ওয়্যারহাউজ) এবং ডিডি সালাউদ্দিন, অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করেছেন। এছাড়াও, নুরউদ্দীন মোঃ আনিছ নামক এক ব্যক্তি টেন্ডার, নিয়োগ, বদলি ও পদায়নসহ ফায়ার সার্ভিসের সব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তিনি ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট গঠন করে অধিদপ্তরের বিভিন্ন কাজ বাগিয়ে নেন এবং চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ডাল ক্রয়ও নিয়ন্ত্রণ করেন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ফায়ার সার্ভিসের জন্য ৮০ কোটি টাকার অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ক্রয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি, ফায়ার সার্ভিসের এক ড্রাইভারের নামে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগও সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে।

সেবা প্রদানেও দুর্নীতির চিত্র কম নয়। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন অফিসার কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র (ফায়ার এক্সটিংগুইশার) রিফিলের নামে প্রতারণার অভিযোগ ওঠার পর তাকে বদলি করা হয়েছে এবং তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে, যেখানে প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। দোকান মালিক সমিতি অভিযোগ করেছে যে, ফায়ার সার্ভিস লাইসেন্স দিতে দুর্নীতি করছে। এছাড়া, ফায়ার সার্ভিসের কিছু কর্মকর্তা ৯০০ টাকার কাজের জন্য ৫-১০ হাজার টাকা ঘুষ নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) 'সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫' যদিও সরাসরি ফায়ার সার্ভিসকে উল্লেখ করেনি, তবে এটি দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে, যা সামগ্রিকভাবে জরুরি সেবা খাতের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। ফায়ার সার্ভিসের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আগুনের ঝুঁকিতে থাকা মার্কেট ও ভবনকে চিহ্নিত ও সতর্ক করার এখতিয়ার থাকলেও মামলা বা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা তাদের নেই। ২০১৪ সালে এ ক্ষমতা দেওয়া হলেও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কারণে তা ভেস্তে গেছে। এই ক্ষমতা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা জননিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

যদিও সরকার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, যেমন ২০টি নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ এবং ১০০টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহ, এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ দুর্নীতির কালো ছায়ায় ম্লান হয়ে যাচ্ছে। মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামালও স্বীকার করেছেন যে বর্তমান সরকারের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও, সাড়া দেওয়ার গড় সময় (২০ মিনিট) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের (৫ মিনিট) চেয়ে অনেক বেশি, যা সেবার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই বিলম্বের কারণ হিসেবে কল লোকেশন তাৎক্ষণিকভাবে পেতে প্রতিবন্ধকতা এবং অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যাকে দায়ী করা হয়। এই অবস্থায়, ফায়ার সার্ভিসের মতো একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিস্তার কেবল আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং জনগণের আস্থা এবং জরুরি মুহূর্তে তাদের জীবন বাঁচানোর সক্ষমতাকেও হ্রাস করছে।

সুপারিশ: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে জেঁকে বসা দুর্নীতি নির্মূলে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত, যা নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, টেন্ডার ও সরঞ্জাম ক্রয় সংক্রান্ত সকল অভিযোগ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করবে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনবে। নিয়োগ প্রক্রিয়াকে শতভাগ স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করতে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করা এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এছাড়া, ফায়ার সার্ভিসকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং এই ক্ষমতা প্রয়োগে কোনো প্রকার রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা জরুরি। জরুরি সেবা ৯৯৯-এর রেসপন্স টাইম কমানোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কল লোকেশন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা উন্নত করা এবং জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা উচিত। একই সাথে, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: মেহজাবিন আক্তার

মেহজাবিন আক্তার, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: জরুরি সেবা ও ফায়ার সার্ভিস।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator