২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বা এআরটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতিতে এক গভীর মোড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। তৎকালীন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বাংলাদেশের পক্ষে এবং মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মূল কাঠামো অনুযায়ী, মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনার বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প, প্রযুক্তি, বিমান, জ্বালানি এবং কৃষিপণ্যের জন্য নিজেদের বাজার উন্মুক্ত করার বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য বোয়িংয়ের ১৪টি উড়োজাহাজ ক্রয়, ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন জ্বালানি অফটেক ব্যবস্থা এবং বছরে অন্তত ৭ লাখ টন গমসহ সয়া ও তুলা আমদানির মতো বিশাল অংকের আর্থিক প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকেই দেশের আমদানি কাঠামো ও বৈদেশিক বাণিজ্যের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নানাবিধ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও বিতর্ক শুরু হয়েছে, যা মূলত দেশের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বকীয়তা এবং নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার ওপর এক বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
চুক্তির শর্ত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র অনিশ্চয়তা ও সংশয় কাজ করছে। একদিকে মার্কিন পণ্যের বাজার-সুবিধা অর্জিত হলেও অন্যদিকে জ্বালানি, খাদ্যশস্য ও ভারী শিল্পপণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট একটি পরাশক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে, ২১ সেপ্টেম্বর দেশে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার পর এই বাণিজ্য চুক্তির বাস্তব প্রভাব নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিনে ১৫৫ টাকা নির্ধারণের ফলে ২০২৬ সালে এটি তৃতীয় দফার মূল্যবৃদ্ধি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের শত শত কোটি টাকার লোকসানের কথা বলে এই মূল্যবৃদ্ধিকে বৈশ্বিক সংকটের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, তবুও এই অজুহাত সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রশমিত করতে পারছে না। আমদানিকৃত পণ্যের বর্ধিত মূল্য এবং মার্কিন জ্বালানি ক্রয়ের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বোঝা শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি এবং সাধারণ ভোক্তাদের ঘাড়েই যে চেপে বসবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ভুক্তভোগী ও অর্থনীতিবিদদের স্পষ্ট অভিমত হলো, সরকারের নীতিনির্ধারকরা শুল্ক ছাড়ের মোহে এমন কিছু দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়-বাধ্যবাধকতা মেনে নিয়েছেন যার প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না, বরং এর মাশুল গুণতে হচ্ছে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে।
এই চুক্তির ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বহুমুখীকরণ বাধাগ্রস্ত হবে কি না এবং ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ কীভাবে পাল্টাবে, তা নিয়েও কূটনৈতিক মহলে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তবে চুক্তির প্রকাশিত নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এতে চীন বা রাশিয়ার মতো দেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর প্রত্যক্ষ কোনো নিষেধাজ্ঞা বা একক উৎসের শর্তারোপ করা হয়নি। যেমন, রাশিয়ার সহযোগিতায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল, তা চুক্তির শর্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় বলে প্রতীয়মান হয়। রূপপুর প্রকল্পের কার্যক্রম সচল রাখা বা না রাখার বিষয়টি মূলত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, রাশিয়ার সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের জটিলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল। তা সত্ত্বেও, মার্কিন জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে বড় অংকের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার কারণে দেশের কৌশলগত জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতায় এক ধরনের প্রচ্ছন্ন প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বারবার তাগিদ দিচ্ছেন যে, রাজনৈতিক আবেগের বশে বা কোনো একপেশে চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে আন্তর্জাতিক বাজারদর, বিকল্প সরবরাহ উৎসের প্রাপ্যতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কিন্তু দেশীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পুরোপুরি স্বচ্ছতা ও সুনির্দিষ্ট হিসাবের ঘাটতি থাকায় জনমনে সংশয় দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই বাণিজ্য চুক্তি এবং সমসাময়িক জ্বালানি সংকটের মারপ্যাঁচে বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক অত্যন্ত সংবেদনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। রপ্তানি বাণিজ্যে শুল্ক সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যের বিশাল বাজার তৈরি করে দেওয়ার এই কৌশল শেষ পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও আমদানির ভারসাম্য রক্ষায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি স্পষ্ট যে, শুধুমাত্র কিছু বড় অঙ্কের চুক্তি স্বাক্ষর বা বাহ্যিক কূটনৈতিক অর্জনের ঢাক পেটানোই যথেষ্ট নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা আর্থিক ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং সাধারণ মানুষের ওপর নেমে আসা অর্থনৈতিক খেসারতের সঠিক মূল্যায়ন করা জরুরি। যদি জ্বালানি, খাদ্যশস্য এবং বিমান খাতের প্রতিটি ক্রয়ের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সর্বাগ্রে বিবেচনা না করা হয় এবং স্বচ্ছতার অভাব অব্যাহত থাকে, তবে এই বাণিজ্য চুক্তি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মুক্তির বদলে বৈদেশিক নির্ভরতার এক নতুন ফাঁদ হয়ে উঠতে পারে। তাই অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন ও জনস্বার্থ রক্ষার স্বার্থে প্রতিটি আমদানি চুক্তির চুলচেরা হিসাব এবং এর প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।