নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট: অদৃশ্য শক্তির কাছে জিম্মি জনজীবন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট: অদৃশ্য শক্তির কাছে জিম্মি জনজীবন

রুমানা পারভীন  avatar   
রুমানা পারভীন
নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট: অদৃশ্য শক্তির কাছে জিম্মি জনজীবন
নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট: অদৃশ্য শক্তির কাছে জিম্মি জনজীবন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই এক অদৃশ্য শক্তির হাতে জিম্মি। চাল, ডাল, তেল, চিনি, ডিম, মুরগি থেকে শুরু করে শাকসবজি পর্যন্ত প্রতিটি পণ...

বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই এক অদৃশ্য শক্তির হাতে জিম্মি। চাল, ডাল, তেল, চিনি, ডিম, মুরগি থেকে শুরু করে শাকসবজি পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তার করছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সাধারণ ভোক্তারা প্রতিনিয়ত উচ্চমূল্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন, যা জনজীবনে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এমনকি কৃষকও তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, কারণ মধ্যস্বত্বভোগী ও বড় আড়তদারদের চক্র তাদের শোষণ করছে। সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত তদারকি ও অভিযান সত্ত্বেও এই সিন্ডিকেট এতটাই বেপরোয়া যে, অনেক সময় প্রশাসনকেও তারা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ডিম ও মুরগির বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বিশেষভাবে প্রকট হয়েছে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) অভিযোগ অনুযায়ী, কর্পোরেট ব্যবসায়ী এবং তেজগাঁওয়ের ডিম ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট মাত্র ২০ দিনে ডিম ও মুরগির দাম বাড়িয়ে প্রায় ২৮০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সরকারের নির্ধারিত মূল্য থাকা সত্ত্বেও তারা এই কারসাজি করেছে, যা প্রমাণ করে বাজারের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ কতটা শক্তিশালী। শুধু ডিম বা মুরগি নয়, ভোজ্যতেল, চিনি, চালসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও দফায় দফায় বাড়ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে। এই অসাধু চক্রের কারণে দেশের অর্থনীতিতে নৈতিকতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যেখানে কৃষক ও সাধারণ মানুষ উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বাজারের এই অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত বাজার তদারকি অভিযান পরিচালনা করছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দল মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজার ও মালিবাগ বাজারে অভিযান চালিয়ে সাতটি প্রতিষ্ঠানকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিউমার্কেট ও গুলশান কাঁচাবাজারে অভিযান চালিয়ে ৭টি প্রতিষ্ঠানকে ২৯ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই মাসে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ঢাকা মহানগরসহ ৪৮টি জেলায় ৫৫টি টিম নিয়ে অভিযান চালিয়ে ১১৪টি প্রতিষ্ঠানকে ৬ লাখ ৩৪ হাজার টাকা জরিমানা করে। এমনকি ২০২৬ সালের মে মাসে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ঘোষণা করেছেন যে, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং কারসাজি বন্ধে সরকার আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান। এছাড়া, 'দ্য কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট, ১৯৫৬' যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সিলেট জেলায় কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ করে কৃষি মার্কেট চালুর পাইলটিং প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এর পেছনে রয়েছে গভীর কাঠামোগত সমস্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু 'সিন্ডিকেট' নয়, বরং বাজারের অব্যবস্থাপনা এবং সরকারের ভুল নীতিও মূল্যবৃদ্ধির জন্য অনেকাংশে দায়ী। 'প্রতিযোগিতা আইন ২০১২' থাকলেও এর বাস্তবায়নে দুর্বলতা রয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন একই সঙ্গে বাদী, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বিচারকের ভূমিকা পালন করায় আইনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক সময় শুল্ক ছাড়ের মতো অস্থায়ী নীতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রমাণিত হচ্ছে। এছাড়াও, খাদ্যগুদামগুলোতেও সিন্ডিকেটের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, যেখানে প্রকৃত কৃষকরা ধান-চাল সরবরাহ করতে পারছেন না এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী, মিলার ও ডিলারদের যোগসাজশে অনিয়ম চলছে। ডলার সংকট এবং আমদানি-রপ্তানিতে অনিয়মের মাধ্যমে টাকা পাচারও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বাজার সিন্ডিকেট শনাক্ত ও ভাঙার ওপর জোর দিয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, সরকার সিন্ডিকেট শনাক্তে কাজ করছে এবং ডিম ও ভোজ্যতেলের আমদানি শুল্ক কমানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ঘোষণা করেন যে, বাজার সিন্ডিকেট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রয়োগ করা হবে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তিনি ঝিনাইদহের শৈলকূপায় পাট ও পেঁয়াজের পাইকারি হাট পরিদর্শন করে কৃষকদের কাছ থেকে অবৈধ তোলা আদায়ের বিষয়টি তুলে ধরেন এবং সিন্ডিকেট ভাঙার অঙ্গীকার করেন। এই কঠোর বার্তা সত্ত্বেও, বাজারের অস্থিরতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি, যা প্রমাণ করে এই সমস্যা কতটা গভীরে প্রোথিত।

সুপারিশ: নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। প্রথমত, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনকে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে, যাতে তারা কার্যকরভাবে সিন্ডিকেট ও কার্টেল বিরোধী মামলা পরিচালনা করতে পারে এবং তাদের বিচারিক ক্ষমতা পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে বাজারের নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে পাইকারি ও আমদানি পর্যায়ে। তৃতীয়ত, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য সংগ্রহ ও বিক্রির জন্য 'কৃষকের হাট'-এর মতো মডেল সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং খাদ্যগুদামগুলোতে সিন্ডিকেটের প্রভাব দূর করতে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, এআই-ভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়ন করে বাজারের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা আনতে হবে। পঞ্চমত, ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে মজুতদার ও কারসাজিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং আমদানি-রপ্তানিতে দুর্নীতি ও অর্থ পাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিশেষে, বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা আনতে একটি শক্তিশালী 'জাতীয় বাজার স্থিতিশীলতা কমিশন' গঠনের প্রস্তাবটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত, যা বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনবে এবং অবৈধ মূল্য কারসাজি রোধ করবে।


🔎 অনুসন্ধানে: রুমানা পারভীন

রুমানা পারভীন, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: নিত্যপণ্য ও পাইকারি বাজার সিন্ডিকেট

No comments found


News Card Generator