বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি

বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

ব্যারিস্টার রাজীব  avatar   
ব্যারিস্টার রাজীব
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের ৪৩টি ভার্চুয়াল বেঞ্চে একযোগে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দেশের বিচার ব্যবস্থায় প্রযুক্তির এক নবদিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই পদক্ষেপ কেবল কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে সৃষ্ট স্থবিরতাকে কাটিয়ে ওঠার প্রয়াস ছিল না, বরং বিচার প্রক্রিয়াকে আধুনিক, গতিশীল ও জনমুখী করার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। বিশেষ করে, 'আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০' প্রণয়নের পর থেকে ই-ফাইলিং, ভার্চুয়াল শুনানি এবং ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মতো উদ্যোগগুলো বিচার প্রার্থীদের জন্য বিচার প্রক্রিয়াকে আরও সহজলভ্য ও কার্যকর করার দিকে মনোনিবেশ করেছে। তবে, এই রূপান্তরের পথ মসৃণ নয়; অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এবং সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান।

বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশ সরকারের 'ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প', যা বিশ্বব্যাংকের প্রায় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো স্থাপন, বিচারক ও কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ, এবং একটি সমন্বিত ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS) প্রবর্তনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পের তদারকি ও বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছে, যেখানে ই-ফাইলিং সিস্টেমের মাধ্যমে মামলার আবেদন থেকে শুরু করে রায় প্রদান পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। এর ফলে, মামলার জট কমানো এবং বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত উচ্চ আদালতে প্রায় ৮৫ হাজার ভার্চুয়াল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত বিচার প্রাপ্তিতে সহায়ক হয়েছে। তবে, এখনো বহু গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের দুর্বলতা এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট ই-জুডিশিয়ারি ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে বড় বাধা সৃষ্টি করছে, যা ডিজিটাল বিভাজনকে আরও প্রকট করে তুলছে।

ডিজিটাল রূপান্তরের পথে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলো 'ভার্চুয়াল কোর্ট' ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন। কোভিড-১৯ পরিস্থিতি চলাকালীন এটি বিচারিক কার্যক্রমে স্থবিরতা এড়াতে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভার্চুয়াল কোর্ট চালুর পর থেকে দেশের বিভিন্ন আদালতে লক্ষাধিক আসামিকে জামিন দেওয়া সম্ভব হয়েছে, যা শারীরিক উপস্থিতির ঝুঁকি কমিয়েছে এবং কারা অভ্যন্তরের ভিড় নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ সরকার 'মাইকোর্ট' (MyCourt) নামক একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে বিচারপ্রার্থীরা ঘরে বসেই তাদের মামলার সর্বশেষ অবস্থা, পরবর্তী শুনানির তারিখ এবং বিচারকের আদেশ সম্পর্কে জানতে পারবেন। এই উদ্যোগগুলো বিচার ব্যবস্থাকে কেবল আধুনিকই করছে না, বরং বিচার প্রার্থীদের দোরগোড়ায় নিয়ে আসছে। কিন্তু, এই ডিজিটাল ব্যবস্থার সুরক্ষায় সাইবার নিরাপত্তা একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। বিচারিক ডেটার গোপনীয়তা, অখণ্ডতা এবং প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে পুরো সিস্টেম হুমকির মুখে পড়তে পারে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিচারিক ডেটার সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের পাশাপাশি আইনগত কাঠামো শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়েছে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২
ই-ফাইলিং এর মাধ্যমে দায়েরকৃত মামলার সংখ্যা (অধস্তন আদালত) ১০,৪৫৬ ৪৫,১২৩ ৮৮,৬৭৮
ভার্চুয়াল শুনানির সংখ্যা (উচ্চ ও অধস্তন আদালত) ১,১২,৩০০ ৩,৭৮,৪০০ ৫,৫০,৯০০
ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS) বাস্তবায়িত আদালতের সংখ্যা ৯৮ ২২৫ ৪০০
বিচারক ও কর্মচারী যাদের ডিজিটাল প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৮,৫০০ ১৫,০০০ ২৪,০০০
বিচার বিভাগের ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি (শতাংশ) ১২% ১৮% ২৩%

উৎস: আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সুপারিশ

  • বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য অবকাঠামোগত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে একটি সুনির্দিষ্ট পঞ্চবার্ষিক বাজেট পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (BCC) কারিগরি সহায়তা নিয়ে প্রতিটি আদালত প্রাঙ্গণে নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
  • বিচারক, আইনজীবী ও আদালতের কর্মচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত ডিজিটাল সাক্ষরতা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটকে (JATI) এই প্রশিক্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে, যা ই-ফাইলিং, ভার্চুয়াল শুনানি ও সাইবার নিরাপত্তার মৌলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করবে।
  • বিচারিক ডেটার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এবং ডেটা সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বিদ্যমান ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর আওতায় বিচারিক ডেটার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রোটোকল তৈরি করতে হবে এবং একটি স্বাধীন ডেটা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ (Data Protection Authority) গঠন করে বিচারিক তথ্যসমূহের গোপনীয়তা ও অখণ্ডতা নিশ্চিত করার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার রাজীব

ব্যারিস্টার রাজীব 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বিচার বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator