রোববার দুপুর ১২টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অত্যন্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যখন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সন্দেহ করে এক রিকশাচালককে ধরে ফেলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ওই রিকশাচালক যখন প্রধান ফটকের সামনে দিয়ে রিকশা চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ করেই তিনি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন। এই স্লোগানকে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে উপস্থিত ছাত্রদল নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং তার পথরোধ করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে বিষয়টি ক্যাম্পাসের আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ শিক্ষার্থী ও পথচারীদের মধ্যে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কোনো ধরনের আইনি এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে কোনো সাধারণ নাগরিককে এভাবে সোপর্দ করার ঘটনাটি ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের এক যুগ্ম আহ্বায়ক গণমাধ্যমকে জানান, নিষিদ্ধ ও পলাতক আওয়ামী লীগের ঘোষিত কথিত ‘লকডাউন’ কর্মসূচির প্রতিবাদে গত দিন থেকেই তাদের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাস ও এর আশপাশের এলাকায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তাদের দাবি, রাষ্ট্রবিরোধী বা নিষিদ্ধ সংগঠনের যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে তারা রাজপথে সতর্ক রয়েছেন। তবে বরগুনা জেলার বাসিন্দা এবং মনির হিসেবে পরিচয় দেওয়া ওই রিকশাচালকের সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কোনো সাংগঠনিক বা আর্থিক সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ মেলেনি। নিছক একটি রাজনৈতিক স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে একজন নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষকে এভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হেনস্তা করার বিষয়টি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সমাজ বিশ্লেষকরা।
এদিকে পুরো বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলাম গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এক রিকশাচালককে ধরে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। তবে পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়েছে যে, থানায় সোপর্দ করার আগে ওই রিকশাচালককে মারধর করা হয়েছিল, যার ফলে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। এই পরিস্থিতির দ্রুত সুরাহা করতে পুলিশ তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালে পাঠিয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর এবং তার শারীরিক অবস্থা সম্পূর্ণ স্থিতিশীল হওয়ার পরই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে পুলিশের নথিপত্র এবং আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সংঘটিত এমন সহিংসতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই আকস্মিক ঘটনাটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশের এলাকায় রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা এবং সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তাহীনতার চিত্রকে অত্যন্ত নগ্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। দেশে চলমান রাজনৈতিক পালাবদলের এই সন্ধিক্ষণে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ প্রায়শই অন্ধ আক্রোশ ও রাজনৈতিক সহিংসতার বলিরিপাথারে পরিণত হচ্ছেন, যা কোনোভাবেই একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনভিত্তিক সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের বিচারবহির্ভূত এমন তৎপরতা সাধারণ মানুষের স্বাধীনভাবে চলাচলের মৌলিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে খর্ব করছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে এবং ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর সংযত হওয়া প্রয়োজন, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর ও পেশাদার ভূমিকা পালন করতে হবে যাতে কোনো নিরপরাধ নাগরিক অযথা হয়রানি বা সহিংসতার শিকার না হন।