গত শনিবার দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম মহানগরীর সদরঘাট থানাধীন পশ্চিম মাদারবাড়ি এলাকায় এক অমানবিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক নিরাপত্তার চরম অবক্ষয়কে উন্মোচন করেছে। মাদকাসক্তির ভয়াল গ্রাসে অন্ধ হয়ে লোকমান হোসেন সাগর নামের ছাব্বিশ বছর বয়সী এক ব্যক্তি তার মাত্র ২০ মাস বয়সী শিশুকন্যা ফাতেমা আক্তারকে বাসা থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান। অভিযুক্ত লোকমানের মূল উদ্দেশ্য ছিল অবুঝ সন্তানকে নগদ অর্থের বিনিময়ে অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দেওয়া এবং সেই লব্ধ অর্থে নিজের মাদকের নেশা মেটানো। ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে এই ভয়ংকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলাকালে শিশুটির মা সীমা বেগম চরম উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের মধ্যে পড়েন। উপায়ান্তর না দেখে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সহায়তা প্রার্থনা করেন, যার ফলে একটি বড় ধরনের সামাজিক বিপর্যয় ও মর্মান্তিক অপরাধ ঠেকানো সম্ভব হয়। ঘটনাস্থল হিসেবে চিহ্নিত সদরঘাট থানার পানির ট্যাংকি এলাকার বাচ্চু মিয়ার ভাড়া বাসা থেকে শিশুটিকে কৌশলে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যা অপরাধের ধরনের দিক থেকে অত্যন্ত ঘৃণ্য ও পরিকল্পিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভুক্তভোগী নারী সীমা বেগমের অভিযোগ অনুযায়ী, তার স্বামী লোকমান দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর মাদকাসক্ত এবং এই নেশার টাকা জোগাড় করতে এর আগেও নানা ধরনের পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি করে আসছিলেন। মাদকাসক্তি কীভাবে একজন মানুষের পারিবারিক ও নৈতিক বোধকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে, এই ঘটনা তার একটি জীবন্ত ও বেদনাদায়ক দলিল। লোকমান যখন তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাতের আঁধারে বাসা থেকে বের করে নিয়ে যান, তখন একজন মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ এবং অসহায়ত্ব সামাজিক কাঠামোর চরম ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্ত সাগর তার নিজের রক্তের সম্পর্কের সন্তানকে বাজারের পণ্যের মতো বিক্রি করার জন্য সরাসরি তার এক খালাত ভাইয়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে সৌভাগ্যবশত, সেই খালাত ভাই সাগরের এই বিকৃত মানসিকতা ও অপরাধমূলক প্রস্তাব বুঝতে পেরে চরম ক্ষোভ ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন। তিনি কৌশলে সাগরের হাত থেকে শিশুটিকে নিজের জিম্মায় নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে সংরক্ষণ করেন, যা পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্ধার অভিযানকে অত্যন্ত সহজ করে তুলেছিল। মাদকাসক্ত ব্যক্তির অপরাধপ্রবণতা কেবল তার নিজের জীবনই ধ্বংস করছে না, বরং একটি নিরপরাধ শিশুর জীবনকেও চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ঘটনার তীব্রতা উপলব্ধি করে তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে নামে সদরঘাট থানার পুলিশ এবং নিবিড় অভিযานের মাধ্যমে মাত্র দুই ঘণ্টার মাথায় পশ্চিম মাদারবাড়ির যুগী চাঁদ মসজিদ লেন এলাকা থেকে শিশু ফাতেমা আক্তারকে উদ্ধার করা হয়। সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ একরাম উল্লাহর তদারকিতে পরিচালিত এই দ্রুততম পুলিশি অভিযানে শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে তার মা সীমার কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শিশুটির মা সন্তান ফিরে পাওয়ার পর মানসিক স্বস্তি পেলেও শেষ পর্যন্ত তার স্বামীর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করতে রাজি হননি। এই আইনি পদক্ষেপের অনুপস্থিতি বা ভুক্তভোগী পরিবারের আপস করার প্রবণতা অপরাধীদের পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয় কি না, তা নিয়ে গভীর আইনি ও সামাজিক প্রশ্ন থেকে যায়। পুলিশ এবং স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদকাসক্তির মতো সামাজিক ব্যধির সাথে জড়িত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কেবল সাময়িক উদ্ধার অভিযানই যথেষ্ট নয়, বরং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক, অন্যথায় এ ধরনের নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
এই রোমহর্ষক ঘটনাটি আমাদের সমাজের গভীরে শিকড় গেড়ে বসা মাদক সংস্কৃতির এক নির্মম বাস্তবতাকে পুনরায় জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে, যেখানে পারিবারিক সম্পর্ক ও শিশুদের নিরাপদ শৈশব চরম হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। কেবল ৯৯৯-এর তাৎক্ষণিক কল এবং পুলিশের দ্রুত পদক্ষেপে একটি বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা মিললেও, এর দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। একজন মাদকাসক্ত পিতার ছায়ায় বেড়ে ওঠা শিশুর নিরাপত্তা এবং তার পুনর্বাসনের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে দেখা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের পৈশাচিক মানসিকতার কেউ নিজ সন্তানের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ না পায়। পরিবার এবং রাষ্ট্রের যৌথ তদারকি ছাড়া মাদকাসক্তির এই ভয়াবহ থাবা থেকে সমাজকে রক্ষা করা এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সাপেক্ষে কেবল শিশু উদ্ধারেই সীমাবদ্ধ না থেকে, মাদক কারবারি ও মাদকাসক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।