সরকারি নথি ও সচিবালয়ে দুর্নীতির কালো ছায়া: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সরকারি নথি ও সচিবালয়ে দুর্নীতির কালো ছায়া: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ

আরিফুজ্জামান সজীব  avatar   
আরিফুজ্জামান সজীব
সরকারি নথি ও সচিবালয়ে দুর্নীতির কালো ছায়া: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
সরকারি নথি ও সচিবালয়ে দুর্নীতির কালো ছায়া: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসন, বিশেষ করে সচিবালয় এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দ...

বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসন, বিশেষ করে সচিবালয় এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক। সরকারি সেবা প্রদানে হয়রানি, ফাইল গায়েব, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম এবং সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করছে। দেশের ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির শিকড় গভীরে প্রোথিত, যা সুশাসনের পথে এক বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ত্রাণ অফিসগুলো যেন দুর্নীতির 'স্বর্গরাজ্য'ে পরিণত হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) অফিসগুলোতে কমিশন বাণিজ্য, কাজ না করে ভুয়া বিল তৈরি, এবং নামসর্বস্ব মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সরকারের অভ্যন্তরীণ অডিটে প্রায় ১৫ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে এবং ৩ হাজার ২৪টি অডিট আপত্তি জমা পড়েছে, যার মধ্যে ৯৩০টি অত্যন্ত গুরুতর। একইসাথে, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াতেও অনিয়ম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর এক গবেষণা অনুযায়ী, আমলাতন্ত্র, ঠিকাদার এবং রাজনৈতিক শক্তির ত্রিপক্ষীয় আঁতাতে সরকারি ক্রয়ের বাজার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, যা সুস্থ প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। ই-জিপি (ই-গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট) প্রবর্তনের পরও দরপত্র প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি ও অন্যান্য সমস্যা সম্পূর্ণরূপে দূর করা সম্ভব হয়নি। ভূমি সেবায় দুর্নীতির লাগাম টানতে ভূমি মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও মাঠ পর্যায়ে অনিয়ম এখনো বিদ্যমান। ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন ভূমি সেবায় ১ শতাংশ দুর্নীতিও বরদাশত না করার ঘোষণা দিয়েছেন এবং ই-নামজারি ও অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যাতে অবৈধ অর্থ লেনদেনের সুযোগ কমে আসে। তবে সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর গবেষণা বলছে, ই-গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও বাস্তবে নাগরিকদের হয়রানি ও ভোগান্তি কমেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল নির্ভরতা রয়ে গেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ১৩ হাজার কোটি টাকা অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান শুরু করেছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে জমি ক্রয়, অর্থপাচার এবং বিভিন্ন নিয়োগ, পদায়ন ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থ লেনদেন। বিশেষ করে, ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও আটটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আড়ালে ২১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক অনুসন্ধান শুরু করে। সরকারি ফাইল গায়েব হওয়ার ঘটনাও দুর্নীতির একটি বড় দিক। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্ধশত কোটি টাকার ফাইল উদ্দেশ্যমূলকভাবে গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে, যা দুর্নীতি ও অনিয়ম ঢাকার চেষ্টা বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়াও, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে, যা প্রাথমিকভাবে বিদ্যুতের দুর্বল সংযোগের কারণে ঘটেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও, এর পেছনে নাশকতার সন্দেহও ছিল। চট্টগ্রাম আদালত থেকে ১ হাজার ৯১১ মামলার ৯ বস্তা নথি ভাঙারির দোকান থেকে উদ্ধার হওয়ার ঘটনা সরকারি নথিপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জাতীয় পার্টির সংসদ-সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহম্মেদ দাবি করেছেন যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৯০ শতাংশই দুর্নীতিতে যুক্ত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর মতে, বেতন বৃদ্ধি এবং সিভিল সার্ভিস সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও দুর্নীতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রোধ করা যায়নি, কারণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত অর্থনৈতিক শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনেও আমলাদের কাছে ঘুষের টাকার একটি বড় অংশ যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের দুর্নীতিসহ জাতীয় সংসদে উত্থাপিত সকল দুর্নীতির অভিযোগ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত করার কথা জানিয়েছে। তবে দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে, যা কমিশনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর ফলে দুর্নীতির সুযোগ আরও বাড়ার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সুপারিশ: সরকারি নথি ও সচিবালয় সংশ্লিষ্ট দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে, যাতে তারা কোনো প্রকার রাজনৈতিক চাপ ছাড়াই সকল স্তরের দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে। দুদকের নিজস্ব তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করে ই-জিপি ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো দূর করতে হবে এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেট ও যোগসাজশ ভাঙতে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। তৃতীয়ত, ভূমি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় ই-নামজারি ও অনলাইন ভূমি উন্নয়ন করের মতো ডিজিটাল উদ্যোগগুলোকে মাঠ পর্যায়ে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ডিজিটাল সেবায় নাগরিকদের হয়রানি বন্ধে মনিটরিং জোরদার করতে হবে। চতুর্থত, সরকারি নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে, মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের অপব্যবহার রোধে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। পঞ্চমত, সরকারি ফাইল ও নথিপত্রের ডিজিটাল সংরক্ষণাগার তৈরি করে ফাইল গায়েব হওয়ার ঘটনা রোধ করতে হবে এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে হবে। পরিশেষে, জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা সম্ভব।


🔎 অনুসন্ধানে: আরিফুজ্জামান সজীব

আরিফুজ্জামান সজীব, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি ও সচিবালয় ওয়াচ।

No comments found


News Card Generator