ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি… | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, দেশের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন মার্কেটপ্লেস দারাজ (Daraz) কর্তৃক বিক্রেতাদের পাওনা পরিশোধে বিলম্ব এবং গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগগুলো ডিজ...

সম্প্রতি, দেশের অন্যতম বৃহৎ অনলাইন মার্কেটপ্লেস দারাজ (Daraz) কর্তৃক বিক্রেতাদের পাওনা পরিশোধে বিলম্ব এবং গ্রাহকদের পণ্য সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগগুলো ডিজিটাল বাণিজ্য খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর দুর্বলতা পুনরায় সামনে এনেছে। যদিও দারাজ একটি প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম, এমন ঘটনা এককভাবে তাদের ব্যর্থতা নাও হতে পারে, বরং এটি একটি বৃহত্তর ব্যবস্থার অসম্পূর্ণতা নির্দেশ করে যেখানে ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইলের দ্রুত প্রসারের সাথে তাল মিলিয়ে নীতি ও প্রয়োগের গতি সমানভাবে এগোয়নি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, এই সম্ভাবনাময় খাতটি এখনো একটি সুসংহত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে ভুগছে, যা একদিকে ভোক্তাদের আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে সৎ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাত গত এক দশকে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন সময়ে এটি দ্রুত দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই দ্রুত বিকাশ সত্ত্বেও, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত ই-কমার্স নীতিমালা ২০১৮ এবং ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা ২০২০ মূলত খণ্ডিত এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে বহুলাংশে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। নীতিমালায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা, পণ্য সরবরাহ ও ফেরত প্রক্রিয়া, এবং ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য সুস্পষ্ট ও কার্যকর নির্দেশনার অভাব রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ফেসবুক ভিত্তিক এফ-কমার্স, যা দেশের ডিজিটাল রিটেইল খাতের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে, তা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই অনিয়ন্ত্রিত। এখানে বিক্রেতার পরিচয়, পণ্যের গুণগত মান এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়, যা NBR এর জন্য কর আদায়ের ক্ষেত্রেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি একদিকে যেমন অসংখ্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করেছে, তেমনি অন্যদিকে অসংখ্য প্রতারণার সুযোগও সৃষ্টি করেছে, যা পুরো খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং আইনি ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও এই খাতের দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ। যেখানে NBR ডিজিটাল লেনদেনের ওপর ভ্যাট ও ট্যাক্স আরোপের চেষ্টা করছে, সেখানে বহু অনলাইন বিক্রেতা, বিশেষ করে এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো, করের আওতার বাইরে রয়ে গেছে। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং ডিজিটাল অর্থনীতির আনুষ্ঠানিকীকরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) যদিও ই-কমার্সের মাধ্যমে দেশের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা দেখছে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও মানসম্মত পণ্য সরবরাহের ঘাটতি এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে দিচ্ছে না। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) বারবার একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরলেও, এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখা যায়নি। বর্তমান ব্যবস্থায়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যদিও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, তবে অধিকাংশ ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্রতিষ্ঠান যেহেতু অপ্রাতিষ্ঠানিক বা বেসরকারি, তাই তাদের আর্থিক স্বচ্ছতা ও পরিচালনগত জবাবদিহিতা পর্যবেক্ষণে BSEC-এর সরাসরি ভূমিকা সীমিত। ফলে এই খাতটি একটি দুর্বল নিয়ন্ত্রক পরিবেশের মধ্যেই বেড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

খাত/সূচক ২০১৯ সাল (আনুমানিক) ২০২২ সাল (আনুমানিক) ২০২৩ সাল (আনুমানিক)
ই-কমার্স বাজারের আকার (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ১.৬ ৩.৫ ৪.৫
অনলাইন ক্রেতার সংখ্যা (মিলিয়ন) ১০ ২০ ২৫
দৈনিক ডেলিভারি (হাজার) ৫০-৭০ ২০০-২৫০ ৩০০-৩৫০
এফ-কমার্স উদ্যোক্তার সংখ্যা (হাজার) ৩০০ ৫০০ ৬০০+

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বাজার গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি স্বতন্ত্র 'ডিজিটাল কমার্স আইন' প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে, যা ই-কমার্স ও এফ-কমার্স উভয়কেই সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় আনবে। এই আইনে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়বদ্ধতা, পণ্য ফেরত ও অর্থ ফেরতের নীতিমালা, এবং একটি শক্তিশালী ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া (যেমন: একটি অনলাইন ওমবুডসম্যান অফিস) সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-কে ডিজিটাল কমার্স খাতের জন্য একটি সহজ, ডিজিটাল-ভিত্তিক কর কাঠামো তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে, এফ-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সহজ নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও টায়ার্ড ট্যাক্সেশন পদ্ধতি চালু করে তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনতে হবে, যা একটি ইউনিক ডিজিটাল বিজনেস আইডির মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে, যাতে রাজস্ব আদায় সহজ হয় এবং কর ফাঁকি রোধ করা যায়।
  • CPD এর সুপারিশ অনুযায়ী, সরকার কর্তৃক একটি স্বাধীন 'ডিজিটাল কমার্স রেগুলেটরি অথরিটি' (Digital Commerce Regulatory Authority) প্রতিষ্ঠা করা উচিত, যেখানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ ব্যাংক, এবং শিল্প ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের সমন্বয় থাকবে। এই সংস্থাটি কেবল নীতি প্রণয়ন নয়, বরং কার্যকর প্রয়োগ, বাজার পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে, যা BSEC এর মতো আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বৃহৎ ডিজিটাল প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator