বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের আড়ালে সংঘটিত অর্থ পাচার। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশ থেকে পাচার হওয়া মোট অর্থের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই হয় ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মতো বাণিজ্যিক অপমূল্যায়নের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই)-এর মার্চ ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার, যা বর্তমান বাজারদরে ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি, পাচার হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ৬৮৩ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ এভাবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের কৌশলগুলো অত্যন্ত জটিল ও বহুমুখী। আমদানির ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি মূল্য দেখিয়ে (ওভার-ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানির ক্ষেত্রে কম মূল্য দেখিয়ে (আন্ডার-ইনভয়েসিং) অর্থ পাচার করা হয়। এছাড়াও, ভুয়া চালান, ঘোষিত পরিমাণের চেয়ে কম পণ্য আমদানি (শর্ট শিপিং), একই চালানের নামে একাধিকবার অর্থ পাঠানো (মাল্টি-ইনভয়েসিং) এবং এক পণ্যের আড়ালে অন্য পণ্য আমদানির মতো নানা জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর জুলাই ২০২৫ সালের একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে প্রতি বছর গড়ে ৮.২৭ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। অক্টোবর ২০২৫-এ প্রকাশিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন আরও উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, বাণিজ্যের আড়ালে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে, যা জিডিপির ৩.৪ শতাংশ। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পাচার দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, রাজস্ব আয় এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মার্চ ২০২৬-এ একটি নির্দিষ্ট ব্যাংকে ওভার-ইনভয়েসিংয়ের ঘটনা ধরা পড়ার পর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কঠোর তদারকির নির্দেশ দিয়েছে। একইসাথে, সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ট্রান্সফার প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার রোধে শক্তিশালী নজরদারি ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অক্টোবর ২০২৫-এ বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবার এবং ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারে সাতটি স্বনামধন্য আইনি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করার পরামর্শ দিয়েছে। মার্চ ২০২৬-এ খেলাপি ঋণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপকে অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রথম ধাপে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সর্বশেষ, আগস্ট ২০২৬-এ বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার ঠেকাতে সরকারি সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ৩০ লাখ ডলার বা তার বেশি মূল্যের ঋণপত্র (এলসি) খোলার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করা এবং আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, পণ্যের বিবরণ ও মূল্যের তিন স্তরের আগাম যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্যদিকে, এনবিআর আগস্ট ২০২৬-এ আমদানি-রপ্তানি পণ্য খালাসে অযথা হয়রানি ও বিলম্ব বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে এবং জুন ২০২৬-এ কাস্টমসের খেয়ালখুশিমতো মূল্য নির্ধারণের পরিবর্তে স্বীকৃত ওয়েবসাইট ও জার্নালকে শুল্কায়নের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহারের নতুন আদেশ জারি করেছে।
তবে, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা ও দুর্নীতির চিত্রও স্পষ্ট। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৮ সালেই এনবিআরের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে দুর্নীতির ১৯টি উৎস চিহ্নিত করে ২৬ দফা সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে অটোমেটেড পদ্ধতির অভাব, আমদানি-খালাস চালানের সমন্বয়হীনতা, অকেজো স্ক্যানিং মেশিন ও সিসি ক্যামেরা, এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি-পদায়নে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাব অন্যতম। চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, যেখানে তাদের স্ত্রীরাও দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় এসেছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি-রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তরেও জুলাই ২০২৬-এ রাতভর অনৈতিক কারবার ও ডিজিটাল জালিয়াতির সিন্ডিকেট চিহ্নিত হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যান জুলাই ২০২৫-এ স্বীকার করেছেন যে, ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা ব্যাংক ও কাস্টমসের সম্মিলিত ব্যর্থতা। জানুয়ারি ২০২৬-এ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রায় ২ কোটি ৮৪ লাখ ডলার রপ্তানি মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে। ডিসেম্বর ২০২৪-এ এনবিআর ১০টি শীর্ষ ব্যবসায়ী গ্রুপের (যেমন এস আলম, বেক্সিমকো, জেমকন) বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্তে যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, অসৎ ব্যবসায়ী, কাস্টমস কর্মকর্তা ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই মূলত অর্থ পাচার সম্ভব হচ্ছে।
এই ব্যাপক অর্থ পাচার দেশের অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এটি কেবল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং সরকারের রাজস্ব আয়কেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পাচারকৃত অর্থ প্রায়শই অবৈধভাবে অর্জিত হওয়ায় তা দেশের উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করছে। এছাড়া, এই দুর্নীতি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণকেও কঠিন করে তুলছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৫ সালের পর্যালোচনায় মূল্যস্ফীতিতে স্থানীয় পণ্যের ভূমিকা ৮৪% এবং আমদানি পণ্যের ভূমিকা ১৬% বলা হয়েছে, ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে আমদানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা আমদানীকৃত মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। এনবিআরের আগস্ট ২০২৬-এর নির্দেশনা সত্ত্বেও, মাঠপর্যায়ের কাস্টমস কর্মকর্তারা বর্তমান সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ASYCUDA World সফটওয়্যারের মতো আধুনিক ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব রয়ে গেছে।
সুপারিশ: বাণিজ্যিক লেনদেনের আড়ালে অর্থ পাচার রোধে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। প্রথমত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে। সকল কাস্টমস হাউসে অত্যাধুনিক স্ক্যানিং মেশিন ও সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং সেগুলোর নিরবচ্ছিন্ন কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে, কাস্টমস ও ব্যাংক কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থ পাচারে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে অন্যদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার হয়। প্রয়োজনে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর আরও কঠোর প্রয়োগ এবং সময়োপযোগী সংশোধনের মাধ্যমে আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে হবে। পরিশেষে, আমদানি-রপ্তানি নীতিমালায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা প্রবর্তন করা জরুরি।