বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতি: ডলারের অস্থিরতা এবং অর্থনীতির চোরাবালি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতি: ডলারের অস্থিরতা এবং অর্থনীতির চোরাবালি

ফারহানা ইয়াসমিন  avatar   
ফারহানা ইয়াসমিন
বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতি: ডলারের অস্থিরতা এবং অর্থনীতির চোরাবালি
বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতি: ডলারের অস্থিরতা এবং অর্থনীতির চোরাবালি
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করার পদক্ষেপ এবং এর ফলে টাকার অবমূল্যায়ন দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছ...

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারকে বাজারভিত্তিক করার পদক্ষেপ এবং এর ফলে টাকার অবমূল্যায়ন দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে, যা মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান ধারাকে আরও উসকে দিচ্ছে। গত মার্চ মাসে (২০২৪) মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯.৬৭ শতাংশে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে এক অস্থির চোরাবালির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক দরপতন আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি এবং শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধুমাত্র সাধারণ ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

ডলারের অস্থিরতা এবং এর সঙ্গে যুক্ত মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে বহুবিধ প্রভাব ফেলছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদনশীল খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ উৎপাদন ব্যয় বহন করতে বাধ্য হচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের খুচরা মূল্যে প্রতিফলিত হচ্ছে। এটি শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নয়, বরং নির্মাণ সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEPZA) থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোকেও কাঁচামাল আমদানির জন্য উচ্চ বিনিময় হার দিতে হচ্ছে, যা তাদের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস করছে। একইসাথে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) আমদানি শুল্ক ও কর বাবদ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, কারণ উচ্চ ডলার মূল্যের কারণে আমদানি কমে যাওয়ায় শুল্ক আদায় কমে যাচ্ছে, যা সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

এই পরিস্থিতি দেশের পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক পরিচালিত বাজার পর্যালোচনা অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফায় প্রভাব পড়ছে, যা তাদের শেয়ারের দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) তাদের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিচ্ছে, যা তাদের সঞ্চয়ের ক্ষমতাকে হ্রাস করছে এবং জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যদিও টাকার অবমূল্যায়ন রপ্তানিকারকদের জন্য কিছুটা সুবিধা দেওয়ার কথা, কিন্তু আমদানিকৃত কাঁচামালের ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে, এই সুবিধা সম্পূর্ণভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বরং, অনেক রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাজার তদারকি জোরদার করলেও, ডলারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব স্থানীয় বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সময়কাল মাসিক গড় মূল্যস্ফীতি (CPI) ডলার-টাকা বিনিময় হার (গড়)
মার্চ ২০২৩ ৯.৬৭% ১০৬.০০ টাকা
জুন ২০২৩ ৯.৭৪% ১০৮.৭৫ টাকা
সেপ্টেম্বর ২০২৩ ৯.৬৩% ১০৯.৫০ টাকা
ডিসেম্বর ২০২৩ ৯.৪১% ১১০.০০ টাকা
মার্চ ২০২৪ ৯.৬৭% ১১০.৫০ টাকা

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংককে তার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নীতিতে আরও স্বচ্ছতা ও সক্রিয়তা আনতে হবে। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন এবং কার্যকর তদারকির মাধ্যমে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'ফরেন এক্সচেঞ্জ ইন্টারভেনশন ফ্রেমওয়ার্ক' বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে আমদানি পর্যায়ে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও শিল্প কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও কর হার যৌক্তিকীকরণ করতে হবে, যাতে উৎপাদন ব্যয় কমানো যায় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ হ্রাস পায়। পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের জন্য করের ভিত্তি সম্প্রসারণ ও কর ফাঁকি রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যেমন স্বয়ংক্রিয় কর নিরীক্ষা পদ্ধতি (Automated Tax Audit System) প্রবর্তন।
  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বাজার তদারকি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং মজুতদারি ও সিন্ডিকেটের কারসাজি কঠোরভাবে দমনের জন্য ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর অধীনে নিয়মিত অভিযান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে একটি 'সাপ্লাই চেইন মনিটরিং ইউনিট' গঠন ও কার্যকর করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহানা ইয়াসমিন

ফারহানা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator