অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

ব্যারিস্টার নাদিয়া  avatar   
ব্যারিস্টার নাদিয়া
অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'টেক-ইনোভা লিমিটেড'-এর তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক সফটওয়্যারের সোর্স কোডের অবৈধ অনুলিপি তৈরির অভিযোগে ...
অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান 'টেক-ইনোভা লিমিটেড'-এর তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক সফটওয়্যারের সোর্স কোডের অবৈধ অনুলিপি তৈরির অভিযোগে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঢাকা জজ কোর্টে দায়ের করা মেধা স্বত্ব লঙ্ঘনের মামলাটি বাংলাদেশের মেধা স্বত্ব আইনের কার্যকারিতা এবং প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই মামলায় আইনি জটিলতা, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা এবং ডিজিটাল মেধা স্বত্বের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যার অভাবে দেশের উদ্ভাবক ও শিল্পীরা তাদের সৃজনশীল কাজের সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন। এই ঘটনা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন আইনি লড়াই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক মেধা স্বত্ব সুরক্ষা কাঠামোর দুর্বলতা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলার অক্ষমতার একটি প্রতিচ্ছবি। একদিকে যেমন উদ্ভাবনের জোয়ার বইছে, অন্যদিকে তেমনই বিদ্যমান আইন ও তার প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা উদ্ভাবকদের নিরুৎসাহিত করছে, যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের মেধা স্বত্ব সুরক্ষা ব্যবস্থা মূলত কপিরাইট আইন, ২০০০ (২০২৩ সালে সংশোধিত) এবং পেটেন্ট ও ডিজাইন আইন, ১৯১১ (যার সংশোধনী প্রক্রিয়াধীন) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কপিরাইট আইন, ২০০০-এর সর্বশেষ সংশোধনীতে ডিজিটাল কপিরাইট এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সৃষ্টিকর্মের সুরক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। বিশেষ করে, ডিজিটাল কনটেন্ট, সফটওয়্যার এবং ডেটাবেজের মতো আধুনিক সৃষ্টিকর্মের সুরক্ষায় এই সংশোধনীগুলো প্রাসঙ্গিকতা অর্জনে সহায়ক। তবে, আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর কার্যকর প্রয়োগ এবং বিচারকদের মধ্যে ডিজিটাল মেধা স্বত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে মেধা স্বত্ব লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রতিকার প্রদান করা বিদ্যমান প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থার জন্য এখনও কঠিন। কপিরাইট অফিস, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করলেও, এর জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বর্তমান সময়ের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে, অসংখ্য ডিজিটাল সৃষ্টিকর্ম অনুলিপিকরণের শিকার হলেও, কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের হার অত্যন্ত নগণ্য।

অন্যদিকে, পেটেন্ট ও ডিজাইন আইন, ১৯১১, যা প্রায় এক শতাব্দীর পুরনো, বর্তমান বিশ্বায়িত অর্থনীতি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির যুগে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। এই আইনটি আধুনিক উদ্ভাবন, বায়োটেকনোলজি, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ন্যানোটেকনোলজির মতো ক্ষেত্রগুলির মেধা স্বত্ব সুরক্ষায় পর্যাপ্ত বিধান দিতে অক্ষম। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের উদ্ভাবকরা তাদের যুগান্তকারী আবিষ্কারের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সুরক্ষা পেতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যা তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি), শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হলেও, এর প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত নয়। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মেধা স্বত্ব অবকাঠামোর আধুনিকীকরণের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে এবং এই খাতে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মতে, একটি শক্তিশালী ও আধুনিক পেটেন্ট ব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর বৃদ্ধি এবং স্থানীয় গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কার্যক্রমে উৎসাহ প্রদানের জন্য অপরিহার্য। একটি কার্যকর মেধা স্বত্ব ব্যবস্থা না থাকলে, বাংলাদেশ সরকার 'মেড ইন বাংলাদেশ' ধারণাকে উৎসাহিত করতে এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে।

বছর পেটেন্ট আবেদন (সংখ্যা) কপিরাইট নিবন্ধন (সংখ্যা) শিল্প নকশা নিবন্ধন (সংখ্যা)
২০১৮ ৩৮৫ ১১২০ ৫১৫
২০১৯ ৪১০ ১৩৫০ ৬০০
২০২০ ৩৫০ ১১৮০ ৫৩০
২০২১ ৪৫০ ১৪০০ ৬৫০
২০২২ ৪৮০ ১৫২০ ৭০০
২০২৩ ৫২০ ১৭০০ ৭৫০

উৎস: বাংলাদেশ পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) এবং কপিরাইট অফিস, বাংলাদেশ (২০১৮-২০২৩ সালের আনুমানিক গড় উপাত্তের ভিত্তিতে)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অবিলম্বে পেটেন্ট ও ডিজাইন আইন, ১৯১১-এর একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী সংস্করণ প্রণয়ন করা উচিত, যা বর্তমান বৈশ্বিক মেধা স্বত্ব মানদণ্ড এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রগুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এই নতুন আইন প্রণয়নে বিশ্ব মেধা স্বত্ব সংস্থা (WIPO)-এর গাইডলাইন এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি-এর কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
  • মেধা স্বত্ব সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক সুপ্রিম কোর্ট এবং জেলা আদালতসমূহে মেধা স্বত্ব বিষয়ক বিশেষায়িত বেঞ্চ স্থাপন করা প্রয়োজন। একইসাথে, বিচারক ও আইনজীবীদের জন্য কপিরাইট আইন, পেটেন্ট আইন এবং ডিজিটাল মেধা স্বত্ব বিষয়ে নিয়মিত বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা উচিত, যার জন্য ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবি থেকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা চাওয়া যেতে পারে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (শিল্প মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়) কর্তৃক বাংলাদেশ পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) এবং কপিরাইট অফিস-এর ডিজিটাল অবকাঠামো ও মানবসম্পদ সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি পাঁচ বছর মেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা উচিত। এই পরিকল্পনায় উদ্ভাবক ও শিল্পীদের জন্য অনলাইন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মেধা স্বত্ব লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিকার প্রদানের জন্য একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপর জোর দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার নাদিয়া

ব্যারিস্টার নাদিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator