চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও বাংলাদেশের কর্মবাজার: সনাতনী শিক্ষার শেকল… | আই নিউজ বিডি

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও বাংলাদেশের কর্মবাজার: সনাতনী শিক্ষার শেকল ছিঁড়ে নতুন দক্ষতার সন্ধানে

আরিফুর রহমান  avatar   
আরিফুর রহমান
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও বাংলাদেশের কর্মবাজার: সনাতনী শিক্ষার শেকল ছিঁড়ে নতুন দক্ষতার সন্ধানে
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও বাংলাদেশের কর্মবাজার: সনাতনী শিক্ষার শেকল ছিঁড়ে নতুন দক্ষতার সন্ধানে
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশের উচ্চশিক্ষার মান এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতার অভাব নিয়ে গভীর উদ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশের উচ্চশিক্ষার মান এবং কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতার অভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত পাঁচ বছরে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে প্রায় ৪০% কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে সংগ্রাম করছে, যা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পরিবর্তিত কর্মবাজারের ব্যাপক অসামঞ্জস্যের দিকে ইঙ্গিত করে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীর ভবিষ্যৎ স্বপ্ন এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা। একদিকে যখন বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স এবং ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT)-এর মতো প্রযুক্তিগুলি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিলুপ্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে, তখন বাংলাদেশের সনাতনী শিক্ষাব্যবস্থা প্রায়শই মুখস্থ বিদ্যা এবং তাত্ত্বিক জ্ঞানের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের আধুনিক কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের কর্মবাজারকে সুরক্ষিত রাখতে এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কেবল প্রযুক্তির অগ্রগতি নয়, এটি উৎপাদন, পরিষেবা এবং জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে এক মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একই সাথে বিশাল সম্ভাবনা এবং গুরুতর চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষত উচ্চশিক্ষা, তত্ত্ব-নির্ভর এবং সাধারণ জ্ঞানের উপর বেশি জোর দিয়েছে, যা শিল্প ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তিত চাহিদা পূরণে অক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, যখন বিশ্বজুড়ে ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং সাইবার নিরাপত্তা পেশাদারদের চাহিদা আকাশচুম্বী, তখন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তৈরির জন্য পর্যাপ্ত বিভাগ বা আধুনিক সিলেবাসের অভাব প্রকট। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির তুলনায় মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি, যা ভবিষ্যতের কর্মবাজারের চাহিদা পূরণে একটি কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করছে। এর ফলস্বরূপ, একদিকে যেমন দক্ষ জনশক্তির অভাব শিল্প-কারখানাগুলোকে বিদেশি বিশেষজ্ঞের উপর নির্ভরশীল করে তুলছে, অন্যদিকে ডিগ্রিধারী শিক্ষিত তরুণরা বেকারত্বের অভিশাপে ভুগছে, যা সামাজিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণ হচ্ছে।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং পরিধি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) দক্ষতা উন্নয়নে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির চেষ্টা করছে এবং দক্ষতা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচী পরিচালনার মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এছাড়া, দক্ষতা উন্নয়ন বিনিয়োগ কর্মসূচী (SEIP) এর মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোর মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে, এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, NSDA কর্তৃক প্রণীত জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালার অধীনে প্রশিক্ষণের মান, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে এর সামঞ্জস্য এবং প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে আরো অনেক বিনিয়োগ প্রয়োজন। SEIP এর অধীনে প্রশিক্ষিত জনবলের কর্মসংস্থান হার সন্তোষজনক হলেও, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী অত্যন্ত উন্নত এবং বিশেষায়িত দক্ষতার ক্ষেত্রে এখনো ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক ল্যাব সুবিধা, ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির অভাব এবং যুগোপযোগী পাঠ্যক্রমের অনুপস্থিতি প্রায়শই শিক্ষার্থীদেরকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ধরনের সীমাবদ্ধতাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, কেবলমাত্র কিছু কর্মসূচী প্রবর্তন করলেই হবে না, বরং তাদের গুণগত মান, পরিধি এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলার জন্য একটি সুদূরপ্রসারী এবং সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা আবশ্যক।

সূচক ২০১৮ ২০২৩ প্রবণতা ও মন্তব্য
উচ্চশিক্ষায় কারিগরি/বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নথিভুক্ত শিক্ষার্থীর হার (মোটের %) ১০% ১৪% ধীর বৃদ্ধি, বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় কম
স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যে কর্মসংস্থানহীনতার হার (সাধারণ ধারা) ৩০.৫% ৩৮.৭% কর্মসংস্থানহীনতা বেড়েছে, সনাতনী শিক্ষার দুর্বলতা প্রকাশ
NSDA/SEIP সনদপ্রাপ্ত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচীতে অংশগ্রহণকারী (বার্ষিক) ১,৫০,০০০ জন ৩,২৫,০০০ জন অংশগ্রহণ বেড়েছে, তবে চাহিদা মেটানোর জন্য অপর্যাপ্ত
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিক্স ও ডেটা সায়েন্স সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রাম অফারকারী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩টি ১১টি বৃদ্ধি পেলেও মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় সীমিত
বাংলাদেশের কর্মবাজারে উচ্চ অটোমেশন ঝুঁকিতে থাকা কর্মীর সংখ্যা (আনুমানিক, পরবর্তী ৫-১০ বছরে) ২৫ লক্ষ ৪৫ লক্ষ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাব বাড়ছে, দ্রুত অভিযোজন প্রয়োজন

উৎস: UGC বার্ষিক প্রতিবেদন, BANBEIS, NSDA, SEIP এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত উপাত্তের ভিত্তিতে তৈরি (আনুমানিক)।

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) অবিলম্বে একটি 'চতুর্থ শিল্প বিপ্লব দক্ষতা রূপরেখা' প্রণয়ন করবে, যেখানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি এবং ডেটা সায়েন্সের মতো ক্ষেত্রগুলোতে প্রয়োজনীয় দক্ষতার একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ থাকবে। এই রূপরেখার অধীনে, বিদ্যমান সকল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচী, বিশেষ করে SEIP এর মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোকে আধুনিকীকরণ করা হবে এবং প্রশিক্ষকদের জন্য নিয়মিত আপস্কিলিং প্রোগ্রাম বাধ্যতামূলক করা হবে, যার জন্য ২০২৫ সালের মধ্যে জাতীয় বাজেটে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যৌথভাবে একটি 'জাতীয় পাঠ্যক্রম সংস্কার কমিটি' গঠন করবে, যা আগামী দুই বছরের মধ্যে সকল বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী ঢেলে সাজাবে। এই সংস্কারের আওতায়, প্রতিটি স্নাতক ও ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে কমপক্ষে ৩০% ক্রেডিট ব্যবহারিক শিক্ষা, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ গবেষণা ও প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা বাধ্যতামূলক করা হবে, যা জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো আধুনিকীকরণে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সকল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে অত্যাধুনিক ল্যাব সুবিধা, থ্রিডি প্রিন্টিং, সিএনসি মেশিন, রোবোটিক্স কিট এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি সরঞ্জাম স্থাপন করতে হবে। এই লক্ষ্যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট কমপক্ষে দ্বিগুণ করতে হবে এবং ইন্ডাস্ট্রি ৪.০-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম ক্রয়ে শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধা প্রদানের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে পদক্ষেপ নিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator