নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: ভোক্তাদের নাভিশ্বাস | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: ভোক্তাদের নাভিশ্বাস

রুমানা পারভীন  avatar   
রুমানা পারভীন
নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: ভোক্তাদের নাভিশ্বাস
নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য: ভোক্তাদের নাভিশ্বাস
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, চিনি, ডিম, মাছ-মাংসসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজন...

বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের বাজার দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, চিনি, ডিম, মাছ-মাংসসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহে এই চক্রের বেপরোয়া কারসাজি ভোক্তাদের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। প্রান্তিক কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হলেও সিন্ডিকেটের সদস্যরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাতারাতি হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়েও এই পরিস্থিতি অব্যাহত রয়েছে, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। এমনকি সরকারি খাদ্যগুদামে ধান-চাল সরবরাহেও মধ্যস্বত্বভোগী ও মিলারনির্ভর সিন্ডিকেটের দাপট বিদ্যমান, যার ফলে প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিলেও, কার্যত সিন্ডিকেটের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকছে।

নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেটের কারসাজি একটি প্রধান কারণ। তারা বাজারে চাহিদা বাড়ার আগেই পণ্য মজুত করে কৃত্রিম অভাব তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচের সামান্য বৃদ্ধিকে অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের মূল্যে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন ঘটানো হয়, যা প্রকৃত হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, সিদ্ধান্তহীনতা ও বাজার অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারও উল্লেখ করেছেন যে, মধ্যস্বত্বভোগীরা সমস্যা তৈরি না করলে পণ্যের দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর (ডিএনসিআরপি) নিয়মিত বাজার তদারকি অভিযান পরিচালনা করলেও, অসাধু ব্যবসায়ীরা মূল্য তালিকা প্রদর্শন না করা, ওজনে কারচুপি এবং ক্রয়-বিক্রয় রসিদ সংরক্ষণ না করাসহ বিভিন্ন অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি কারওয়ান বাজারের মতো বড় পাইকারি বাজারগুলোতেও কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থায় ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীদের উপস্থিতি রয়েছে, যাদের কোনো ব্যবসায়িক পরিচয় বা নিবন্ধন নেই।

সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, যেমন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাজার নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি জানিয়েছেন, যৌক্তিক মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সক্রিয় রয়েছে এবং 'দ্য কন্ট্রোল অফ এসেন্সিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট' যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও অঙ্গীকার করেছেন যে, বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে বাজার সিন্ডিকেটের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হওয়ার এই স্মৃতি বাংলাদেশ থেকে বিদায় দেওয়া হবে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরও বাজারদর তথ্য বাতায়ন, বাজার মনিটরিং ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে। তবে, কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ক্যাব) অভিযোগ করেছে যে, ভোক্তা কর্মকর্তার কাজে বাধা দিয়ে বাজার সিন্ডিকেট গড়ে উঠছে, যা পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে। এছাড়া, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিসি) কর্তৃক পরিচালিত অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম কমার পরও স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব পড়েনি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাম বাড়ানো হয়েছে, যা অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজির ফল।

নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং অসাধু চক্রের কারসাজিতে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, ডিম, মাছ-মাংস ও সবজির দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। অনেক সময় রাজনৈতিক অস্থিরতাও ব্যবসায়ে মন্দা তৈরি করে এবং ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে নিত্যপণ্য আমদানি করতে নিরুৎসাহিত হন, যা সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করে এবং দাম বাড়িয়ে দেয়। এমনকি ডিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন হ্রাস পেলে সিন্ডিকেট সেই সুযোগ নিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়, যদিও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর খামার থেকে বাজার পর্যন্ত তদারকি বাড়ানোর কথা বলছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করছে।

সুপারিশ: নিত্যপণ্যের বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে এবং ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, কৃষি বিপণন আইন ও বিধিমালা এবং দ্য কন্ট্রোল অফ এসেন্সিয়াল কমোডিটিস অ্যাক্ট-এর মতো বিদ্যমান আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে সেগুলোর যুগোপযোগী সংশোধন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করে বাজার তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে বের হতে না পারে। তৃতীয়ত, পণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করে সরবরাহ শৃঙ্খলে স্বচ্ছতা আনতে হবে। চতুর্থত, মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে এবং প্রকৃত কৃষক যাতে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে পারেন, তার জন্য 'কৃষকের হাট'-এর মতো উদ্যোগগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। পঞ্চমত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং তাদের ব্যবসা পরিচালনার লাইসেন্স বাতিলের মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিশেষে, বাজারে গুজব ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে পণ্যের সঠিক তথ্য ও মূল্য তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে, যাতে ভোক্তারা বিভ্রান্ত না হন।


🔎 অনুসন্ধানে: রুমানা পারভীন

রুমানা পারভীন, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: নিত্যপণ্য ও পাইকারি বাজার সিন্ডিকেট।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator