মোবাইল ইন্টারনেটের মান: গ্রাহক অসন্তোষের গভীরে ও সেবার নিশ্চয়তা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মোবাইল ইন্টারনেটের মান: গ্রাহক অসন্তোষের গভীরে ও সেবার নিশ্চয়তা

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
মোবাইল ইন্টারনেটের মান: গ্রাহক অসন্তোষের গভীরে ও সেবার নিশ্চয়তা
মোবাইল ইন্টারনেটের মান: গ্রাহক অসন্তোষের গভীরে ও সেবার নিশ্চয়তা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক কোয়ালিটি অফ সার্ভিস (কিউওএস) ড্রাইভ টেস্ট রিপোর্টে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ও সেব...

সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রকাশিত ত্রৈমাসিক কোয়ালিটি অফ সার্ভিস (কিউওএস) ড্রাইভ টেস্ট রিপোর্টে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ও সেবার মান নিয়ে যে অসঙ্গতি উঠে এসেছে, তা দেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রার পথে এক বড় চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রিপোর্টে দেখা গেছে, ৪জি সেবার ক্ষেত্রে অপারেটরদের ঘোষিত গড় গতি প্রতি সেকেন্ডে ৭ মেগাবিট (এমবিপিএস) হলেও, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। বিশেষ করে, শহরাঞ্চলের বাইরে এবং জনাকীর্ণ এলাকায় এই গতির তারতম্য প্রকট। এই পরিস্থিতি কেবল গ্রাহক অসন্তোষই বাড়াচ্ছে না, বরং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণের যে লক্ষ্যমাত্রা, তার বাস্তবায়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

মোবাইল ইন্টারনেটের এই নিম্নমান বহুবিধ জটিলতার ফল। প্রথমত, স্পেকট্রাম বা তরঙ্গ বরাদ্দ এবং এর সর্বোত্তম ব্যবহার একটি বড় সমস্যা। যদিও বিটিআরসি পর্যায়ক্রমে অপারেটরদের জন্য অতিরিক্ত তরঙ্গ বরাদ্দ করছে, কিন্তু অপারেটরদের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যমান টাওয়ার শেয়ারিং নীতিমালার দুর্বল প্রয়োগের কারণে এই তরঙ্গের পূর্ণ সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে, ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের শেষ মাইল পর্যন্ত পৌঁছানোর খরচ এবং জটিলতা, বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে, মোবাইল ইন্টারনেট সেবার মানকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। বিদ্যমান তারবিহীন অবকাঠামোর সম্প্রসারণে ভূমি অধিগ্রহণ, রাইট-অফ-ওয়ে (আর.ও.ডব্লিউ) প্রাপ্তি এবং স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা অপারেটরদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবও গ্রাহকদের কাছে প্রতিনিয়ত ধীরগতির ইন্টারনেট হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই সমস্যাগুলো একদিকে যেমন গ্রাহকের ডিজিটাল অভিজ্ঞতাকে ব্যাহত করছে, অন্যদিকে তেমনি দেশের উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যেখানে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য।

এই দুর্বল ইন্টারনেট সেবার মান কেবল ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীদের সমস্যা নয়, এটি দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি সকল খাতের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ভিশনের অন্যতম স্তম্ভ হলো ডিজিটাল পরিষেবাগুলোর সহজলভ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি। কিন্তু ধীরগতির ইন্টারনেট সেবা ই-গভর্নেন্স, ডিজিটাল শিক্ষা, টেলিমেডিসিন এবং অনলাইন আর্থিক লেনদেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বাধা সৃষ্টি করছে। এমনকি, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ)-এর অধীনে গড়ে ওঠা হাই-টেক পার্কগুলোতে পরিচালিত উদ্ভাবনী স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তি-নির্ভর শিল্পগুলোর জন্য উচ্চগতির, স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ অপরিহার্য, যা অনেক সময়ই নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিএইচটিপিএ-এর লক্ষ্য যেখানে বৈশ্বিক মানের প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম তৈরি করা, সেখানে ইন্টারনেটের নিম্নমান সেই লক্ষ্য পূরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত তাদের সদস্যদের কাছ থেকে ইন্টারনেট সেবার মান নিয়ে অভিযোগ পাচ্ছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এটুআই (a2i) প্রকল্পের মাধ্যমে যে নাগরিক সেবাগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হচ্ছে, সেগুলোর কার্যকর ব্যবহারের জন্যও নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট অপরিহার্য।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ৫জি প্রযুক্তি নিয়ে যখন দেশব্যাপী আলোচনা চলছে এবং সরকার এই প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য রোডম্যাপ তৈরি করছে, তখন ৪জি সেবার এই বেহাল দশা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। ৫জি প্রযুক্তি কেবল উচ্চ গতিই নয়, এর মূল উদ্দেশ্য হলো অতি নিম্ন ল্যাটেন্সি এবং বিপুল সংখ্যক ডিভাইস সংযোগের সক্ষমতা প্রদান করা, যা ইন্টারনেট অফ থিংস (আইওটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উন্নত ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো অ্যাপ্লিকেশনগুলোর জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু বিদ্যমান ৪জি অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং মানহীন সেবা ৫জি রোলআউটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। অপারেটররা যদি বর্তমান প্রযুক্তিতেই মান বজায় রাখতে না পারে, তবে ৫জি-এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত আপগ্রেডেশন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আইসিটি বিভাগ এবং বিটিআরসি-কে এই বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে যাতে কেবল প্রযুক্তিগত সম্প্রসারণ নয়, বরং সেবার মান নিশ্চিতকরণও অগ্রাধিকার পায়। অপারেটরদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর কিউওএস মানদণ্ড নির্ধারণ ও তার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ জরুরি।

সেবার ধরন বিটিআরসি নির্ধারিত গড় গতি (সর্বনিম্ন) গ্রাহক অভিজ্ঞতাপ্রাপ্ত গড় গতি (আনুমানিক) কল ড্রপ রেট (সর্বোচ্চ) ল্যাটেন্সি (সর্বোচ্চ)
৪জি মোবাইল ইন্টারনেট ৭ এমবিপিএস ২-৪ এমবিপিএস ২% ১০০ মি.সে.
৩জি মোবাইল ইন্টারনেট ২ এমবিপিএস ০.৫-১ এমবিপিএস ৩% ১৫০ মি.সে.
ফাইবার অপটিক (এফটিটিএইচ) ৫০ এমবিপিএস (শুরু) ২০-৩০ এমবিপিএস (শুরু) ০% ২০ মি.সে.

উৎস: বিটিআরসি কিউওএস রিপোর্ট (বিভিন্ন সময়কালের গড়), Opensignal এবং বিভিন্ন গ্রাহক সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রাপ্ত তথ্য।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) কর্তৃক 'কোয়ালিটি অফ সার্ভিস রেগুলেশনস, ২০১৮' এর কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে মোবাইল অপারেটরদের জন্য ন্যূনতম গতি, কল ড্রপ রেট এবং ল্যাটেন্সির মানদণ্ড আরও সুনির্দিষ্ট করা এবং এর ব্যত্যয়ে নিয়মিত ও তাৎক্ষণিক জরিমানা আরোপের বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বিটিআরসিকে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিয়মিত ড্রাইভ টেস্ট পরিচালনা করে ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগকে জাতীয় ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ফাইবার অপটিক কেবল সংযোগ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে হবে এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপিএ) পরিচালিত হাই-টেক পার্কগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে বিশেষ অর্থ বরাদ্দ ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যা 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ভিশনের জন্য অপরিহার্য।
  • বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এবং এটুআই (a2i) এর যৌথ উদ্যোগে একটি জাতীয় ইন্টারনেট পারফরম্যান্স মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে গ্রাহকরা তাদের ইন্টারনেট সেবার মান, গতি এবং কল ড্রপ নিয়ে সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগৃহীত ডেটা বিটিআরসি এবং মোবাইল অপারেটরদের কাছে নিয়মিতভাবে সরবরাহ করে সেবার মানোন্নয়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator