বিসিএস ও পিএসসি: নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির কালো ছায়া, মেধা বনাম অনিয়ম.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিসিএস ও পিএসসি: নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির কালো ছায়া, মেধা বনাম অনিয়ম..

সুমাইয়া বিনতে হক  avatar   
সুমাইয়া বিনতে হক
বিসিএস ও পিএসসি: নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির কালো ছায়া, মেধা বনাম অনিয়ম..
বিসিএস ও পিএসসি: নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির কালো ছায়া, মেধা বনাম অনিয়ম..
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষা দেশের মেধাবী তরুণদের জন্য স্বপ্নের সিঁড়ি হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই নিয়ো.....

বাংলাদেশের সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষা দেশের মেধাবী তরুণদের জন্য স্বপ্নের সিঁড়ি হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রশ্নফাঁসের কালো ছায়া বারবার জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। 'আই নিউজ বিডি'র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই খাতের গভীর ক্ষত। জালিয়াতি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনাগুলো একদিকে যেমন যোগ্য প্রার্থীদের হতাশ করছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্যদের প্রবেশের পথ সুগম করছে, যা সামগ্রিকভাবে সুশাসনের জন্য এক বড় হুমকি।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি ঘটনা নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ৪৮তম বিসিএস (বিশেষ) এমসিকিউ পরীক্ষায় জালিয়াতির দায়ে ৯ জন পরীক্ষার্থীকে আজীবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩ জন বদলি পরীক্ষার্থী ছিলেন এবং তাদের এক মাসের কারাদণ্ডও দেওয়া হয়। ৩৭তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষাতেও জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে, যেখানে একজন প্রার্থী অন্য প্রার্থীর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে পরীক্ষা দিতে এসে আটক হন। এমনকি জাল সনদ ব্যবহার করে বিসিএস ক্যাডারে সরকারি চাকরি নেওয়ার অভিযোগে প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারের তিনজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পিএসসির নিজস্ব তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। ২৯তম বিসিএস পরীক্ষায় অবৈধভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় ৬ জন প্রার্থীকে নিয়োগের সুপারিশ করার অভিযোগে পিএসসির ১৩ জন সদস্য, একজন সাবেক সচিব ও ৬ জন ক্যাডার কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন করেছে দুদক। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরেই অনিয়মের সুযোগ বিদ্যমান এবং এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রভাবশালী চক্র।

প্রশ্নফাঁস সিন্ডিকেটগুলোও এই খাতের একটি বড় সমস্যা। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত সাতটি চক্রকে শনাক্ত করেছে, যারা ২৪ বছর ধরে সক্রিয় এবং বিসিএস ও নন-ক্যাডারের অন্তত ৯টি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। পিএসসির থানা সহকারী শিক্ষা অফিসার পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস চক্রের মূলহোতা মতিউর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িত পিএসসির সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তার নামও তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, যারা শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ। বারবার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পিএসসি বিজি প্রেসে বিসিএসসহ কোনো নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র না ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৪৫তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের সুস্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে চ্যানেল ২৪-এর প্রতিবেদন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা পরীক্ষা বাতিলের দাবি পর্যন্ত গড়িয়েছে। এমনকি বিসিএস প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পিএসসির একজন প্রোগ্রামারকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই চক্রগুলো এতটাই সুসংগঠিত যে, তারা নিরাপদ কক্ষে প্রার্থীদের প্রশ্ন মুখস্থ করিয়ে পরীক্ষা দিতে পাঠাতো।

নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও প্রকট। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সংসদে জানিয়েছেন যে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিসিএস ক্যাডার নিয়োগে দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগের বিষয়ে দুদকসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও তদন্ত করছে এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা নন-ক্যাডার পদে ১১ থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব সচিব কমিটি অনুমোদন করেছে। এই সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তাদের আশঙ্কা এটি মেধার অবমূল্যায়ন, নগ্ন দলীয়করণ ও দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করবে। বিশেষ করে, পিএসসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের পর ভাইভার নম্বর বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসে, যা জনমনে নতুন করে সংশয় তৈরি করেছে। সমালোচকরা বলছেন, ভাইভার নম্বর বাড়লে ইন্টারভিউ বোর্ডের ক্ষমতা বাড়বে এবং রাজনৈতিক বিবেচনার সুযোগ তৈরি হবে, যা কোটা ব্যবস্থার মতো অন্যভাবে ফিরে আসার শঙ্কা তৈরি করতে পারে। এছাড়াও, দশম গ্রেডের চাকরি পিএসসির বাইরে একটি কমিটি দিয়ে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির শঙ্কা তৈরি করেছে।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মেধাবী তরুণরা যখন যোগ্যতা প্রমাণ করেও অনিয়মের শিকার হন, তখন তাদের মধ্যে হতাশা ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়। সরকারি কর্ম কমিশনকে একটি সাংবিধানিক ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, প্রশ্নফাঁস, জালিয়াতি এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে দেশের প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনসেবার মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

সুপারিশ: বিসিএস ও পিএসসি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য: (১) মৌখিক পরীক্ষার নম্বর অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করে লিখিত পরীক্ষার মেধার ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে এবং ভাইভা পদ্ধতিকে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড, একাধিক পরীক্ষক ও স্বচ্ছ স্কোরিং পদ্ধতির আওতায় আনতে হবে। (২) প্রশ্নফাঁস ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তি ও চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, এক্ষেত্রে পিএসসির অভ্যন্তরীণ জড়িতদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। (৩) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের দলীয় প্রভাব বা স্বজনপ্রীতি রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং ২৯তম বিসিএস-এর মতো ঘটনাগুলোর তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। (৪) পিএসসিকে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করতে হবে, যার মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা কমানো, শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করা এবং নন-ক্যাডার নিয়োগ বিধিমালা পুনর্বিবেচনা করা অন্যতম। (৫) সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগে দুর্নীতিবিরোধী কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তকে কার্যকর করতে হবে এবং এর মাধ্যমে সরকারি নিয়োগে অনিয়ম রোধে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে ।


🔎 অনুসন্ধানে: সুমাইয়া বিনতে হক

সুমাইয়া বিনতে হক, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: বিসিএস ও পিএসসি প্রশ্ন/নিয়োগ স্ক্যান্ডাল।

Nessun commento trovato


News Card Generator