এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ড্রোন কৃষি, আকাশ ছুঁতে বাধা কি কেবল খরচ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ড্রোন কৃষি, আকাশ ছুঁতে বাধা কি কেবল খরচ?

মাহমুদুল হাসান  avatar   
মাহমুদুল হাসান
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ড্রোন কৃষি, আকাশ ছুঁতে বাধা কি কেবল খরচ?
এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং: ড্রোন কৃষি, আকাশ ছুঁতে বাধা কি কেবল খরচ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর যৌথ উদ্যোগে গাজীপুরের ভাওয়ালগড়ে আয়োজিত ড্রোন ব্যবহার করে ধানের জমিতে সার ...

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর যৌথ উদ্যোগে গাজীপুরের ভাওয়ালগড়ে আয়োজিত ড্রোন ব্যবহার করে ধানের জমিতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগের প্রদর্শনীটি বাংলাদেশের কৃষিখাতে প্রযুক্তির নব দিগন্ত উন্মোচনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই প্রদর্শনী শুধু একটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতার জানান দেয়নি, বরং স্মার্ট ফার্মিংয়ের পথে বাংলাদেশের অভিযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই আকাশছোঁয়া প্রযুক্তির মূলধারায় আসার পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এর উচ্চ প্রাথমিক ও পরিচালন ব্যয়। প্রশ্ন উঠছে, ড্রোন কৃষি কি কেবল উচ্চবিত্ত কৃষকদের শখের সামগ্রী হয়ে থাকবে, নাকি এটি দেশের বৃহত্তর কৃষক সমাজের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হাতিয়ার হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের আরও গভীরে প্রবেশ করতে হবে।

বাংলাদেশের কৃষিখাত এখনও অনেকাংশে সনাতন পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল, যেখানে শ্রমিকের প্রাপ্যতা ও উৎপাদন ব্যয় ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে এগ্রি-টেক এবং স্মার্ট ফার্মিং, বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। ড্রোন ব্যবহার করে নির্ভুলভাবে ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, রোগ ও পোকা শনাক্তকরণ, নির্দিষ্ট স্থানে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, এবং সেচ ব্যবস্থাপনার মতো কাজগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর গবেষণায় দেখা গেছে, ধানের জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে সার প্রয়োগের তুলনায় ড্রোন ব্যবহার করে সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করলে সারের অপচয় ১৫-২০% কমানো সম্ভব, যা একই সাথে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করে এবং উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনে। এর ফলে ফসলের ফলন বৃদ্ধি পায় এবং কৃষকদের আয় বাড়ে। ডিএই এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের অনেক অঞ্চলে এখনও জমিতে সার ও কীটনাশক প্রয়োগে শ্রমিকের সংকট দেখা যায়, যা সময়মতো প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করে। ড্রোন এই সংকট নিরসনে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে, বিশেষ করে যখন দ্রুত বড় এলাকায় কাজ করার প্রয়োজন হয়। এছাড়াও, পাহাড়ি বা দুর্গম এলাকার কৃষিজমিতে যেখানে মানুষের পক্ষে পৌঁছানো কঠিন, সেখানে ড্রোন কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, যা পূর্বে অব্যবহৃত বা কম ব্যবহৃত জমিগুলোকে উৎপাদনশীল করে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করবে। এই প্রযুক্তি শুধুমাত্র ফসলের উৎপাদনশীলতাই বাড়াবে না, বরং কৃষকদের জন্য নতুন ধরনের কর্মসংস্থানও তৈরি করতে পারে, যেমন ড্রোন অপারেটর, ডেটা বিশ্লেষক ইত্যাদি।

ড্রোন প্রযুক্তির আকাশ ছুঁতে চাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো এর বিশাল অঙ্কের খরচ। একটি আধুনিক কৃষি ড্রোনের মূল্য ৫ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা একজন সাধারণ কৃষকের পক্ষে কেনা প্রায় অসম্ভব। এছাড়াও রয়েছে ড্রোনের ব্যাটারি, রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার লাইসেন্স এবং প্রশিক্ষিত অপারেটরের বেতন বাবদ নিয়মিত খরচ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি একর জমিতে ড্রোন ব্যবহার করে কীটনাশক বা সার প্রয়োগের খরচ এখনও প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে ১০-১৫% বেশি, যদি ড্রোনের প্রাথমিক বিনিয়োগ খরচ এর সাথে যুক্ত করা হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে, সারের অপচয় রোধ, ফসলের ক্ষতি কমানো এবং ফলন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই অতিরিক্ত খরচ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হলেও, প্রাথমিক বিনিয়োগের বোঝা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়াও, ড্রোন পরিচালনার জন্য কারিগরি জ্ঞান এবং ডেটা বিশ্লেষণের সক্ষমতা প্রয়োজন, যা দেশের অধিকাংশ কৃষকের নেই। এই কারিগরি জ্ঞানের অভাব এবং প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতাও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যাপক প্রচলনে একটি বড় অন্তরায়। সরকারি ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ড্রোন সেবা কেন্দ্র স্থাপন এই খরচ কমানোর একটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য ড্রোন ক্রয় বা সেবা গ্রহণ সহজলভ্য করতে পারলে প্রযুক্তির সুফল তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব হবে।

প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাব এবং নীতিগত কাঠামোও ড্রোন কৃষির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় সম্প্রতি কৃষি রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উপর জোর দিয়েছে, যেখানে ড্রোন প্রযুক্তি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। ড্রোন ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট স্থানে ও সঠিক মাত্রায় রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে মাটির স্বাস্থ্য ও ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ কমানো সম্ভব। এর ফলে পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস পায় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা পায়। তবে, ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার শুরুর আগে এর নিরাপত্তা, ডেটা গোপনীয়তা এবং আকাশসীমা ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন। বর্তমানে, বাংলাদেশে ড্রোনের ব্যবহার সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত কৃষি-কেন্দ্রিক নীতিমালা অনুপস্থিত, যা বিনিয়োগকারী ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। ড্রোন দ্বারা সংগৃহীত ডেটার মালিকানা ও ব্যবহারের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে কৃষকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকে। এছাড়াও, ড্রোনের ব্যাটারির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং এর কার্বন ফুটপ্রিন্ট নিয়েও পরিবেশগত দিক থেকে বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ড্রোনের পরিবেশগত সুবিধাগুলো তুলে ধরে এর গ্রহণ যোগ্যতা বাড়ানো যেতে পারে, যা একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থার দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

কার্যক্রম প্রচলিত পদ্ধতি (প্রতি একর) ড্রোন ব্যবহার (প্রতি একর) সাশ্রয়/সুবিধা
সার প্রয়োগ ৳১,২০০ (শ্রমিক+সার অপচয়) ৳১,০০০ (সেবা + কম সার ব্যবহার) ৳২০০ সাশ্রয়, ১৫-২০% সার অপচয় হ্রাস
কীটনাশক প্রয়োগ ৳১,৫০০ (শ্রমিক+অতিরিক্ত স্প্রে) ৳১,২০০ (সেবা + সুনির্দিষ্ট স্প্রে) ৳৩০০ সাশ্রয়, ২০-২৫% কীটনাশক অপচয় হ্রাস
জমির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ অসম্ভব/ম্যানুয়াল জরিপ (সময়সাপেক্ষ) ৳৫০০ (ডেটা বিশ্লেষণ সহ) সময় সাশ্রয়, আগাম রোগ শনাক্তকরণ (২৫-৩০% ফসলের ক্ষতি কমানো সম্ভব)
সেচ ব্যবস্থাপনা আনুমানিক ৳৮০০ (অদক্ষ পানি ব্যবহার) ৳৭০০ (নির্ভুল পানি ব্যবহার) ৳১০০ সাশ্রয়, ১০-১৫% পানি সাশ্রয়
শ্রমিক নির্ভরতা উচ্চ (১-২ জন/দিন) নিম্ন (১ জন অপারেটর/ঘণ্টা) শ্রমিক সংকট নিরসন, দ্রুত কাজ সম্পন্ন

উৎস: ডিএই বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২-২৩ এবং বিএআরসি গবেষণা সমীক্ষা ২০২৩ (প্রক্ষেপিত তথ্য)

সুপারিশ

  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর নেতৃত্বে একটি জাতীয় ড্রোন কৃষি ভর্তুকি ও সেবা কেন্দ্র স্থাপন কর্মসূচি চালু করা হোক, যেখানে কৃষকদের জন্য ড্রোন ক্রয়ে ৩০-৪০% ভর্তুকি এবং সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে এবং প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি করে ড্রোন সেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর তত্ত্বাবধানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর সহযোগিতায় 'কৃষি ড্রোন পরিচালনা ও ডেটা বিশ্লেষণ' বিষয়ক একটি সমন্বিত প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি ও বাধ্যতামূলক করা হোক, যা কৃষকদের এবং কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে প্রদান করা হবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কৃষি খাতে ড্রোন ব্যবহারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা (National Drone Policy for Agriculture) প্রণয়ন করুক, যেখানে ড্রোনের নিবন্ধন, নিরাপত্তা মান, আকাশসীমা ব্যবহার, ডেটা গোপনীয়তা এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের বিস্তারিত নির্দেশিকা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহমুদুল হাসান

মাহমুদুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এগ্রি-টেক (AgriTech) ও স্মার্ট ফার্মিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator