কারাগারে দুর্নীতির কালো ছায়া: বন্দি থেকে কর্মকর্তা, সর্বত্রই অনিয়মের জাল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কারাগারে দুর্নীতির কালো ছায়া: বন্দি থেকে কর্মকর্তা, সর্বত্রই অনিয়মের জাল

নাফিসা রহমান  avatar   
নাফিসা রহমান
কারাগারে দুর্নীতির কালো ছায়া: বন্দি থেকে কর্মকর্তা, সর্বত্রই অনিয়মের জাল
কারাগারে দুর্নীতির কালো ছায়া: বন্দি থেকে কর্মকর্তা, সর্বত্রই অনিয়মের জাল
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার এক জটিল জালে আবদ্ধ। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, এই সংশোধনাগারগুলো যেন অপরাধ...

বাংলাদেশের কারাগারগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার এক জটিল জালে আবদ্ধ। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, এই সংশোধনাগারগুলো যেন অপরাধ সংশোধনের পরিবর্তে অনিয়ম ও অর্থ উপার্জনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ কারারক্ষী পর্যন্ত একটি শক্তিশালী চক্রের মাধ্যমে বন্দিদের বিভিন্ন সুবিধা প্রদান, যেমন – উন্নত খাবার, ভিআইপি সেল, স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ, এমনকি চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারও অর্থের বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে। এসব অনিয়ম দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং বন্দিদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। 'আই নিউজ বিডি'র অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই খাতে দুর্নীতির মাত্রা এতটাই গভীর যে, এর লাগাম টেনে ধরা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কারাগারে দুর্নীতির চিত্র অত্যন্ত বিস্তৃত ও বহুমুখী। বন্দি প্রবেশের মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় অনৈতিক উপায়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া। টাকার বিনিময়ে উন্নত খাবার সরবরাহ, অসুস্থ না হয়েও হাসপাতালে চিকিৎসার নামে আয়েশে থাকা, পছন্দমতো সেলে অবস্থান, এমনকি কম্বল, ব্রাশ, পেস্ট, জুতার মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী ঘিরেও চলে অঘোষিত বাণিজ্য। কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে এই চিত্র বিদ্যমান। অভিযোগ রয়েছে, অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে এই ঘুষ বাণিজ্য পরিচালিত হয়। বন্দিদের স্বজনদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, এবং তথ্যকেন্দ্রে ঘুষ না দিলে জামিনপ্রাপ্ত বন্দিদের সঠিক তথ্যও পাওয়া যায় না। বিশেষ করে, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী 'ভিআইপি বন্দি'দের জন্য কারাগার যেন এক টাকার খেলায় পরিণত হয়েছে। তাদের জন্য ভালো সেলের ব্যবস্থা, বিশেষ সাক্ষাৎ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অর্থের বিনিময়ে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৪-২০২৫) কাশিমপুর ও কেরানীগঞ্জের মতো কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোতে সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ভিআইপি সুবিধা পাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একজন জেলারের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দুর্নীতি, জুলুম ও নির্যাতন চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে, যেখানে অর্থের অভাবে গুরুতর অসুস্থ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই দুর্নীতির পেছনে রয়েছে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ঔপনিবেশিক আমলের পুরনো ধ্যান-ধারণার প্রভাব। বাংলাদেশের কারাগারগুলোর ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার হলেও, বর্তমানে প্রায় ৬৫ হাজার বন্দি রয়েছে, যা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি। এই অতিরিক্ত বন্দির চাপ কারাগার ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং অনিয়মের সুযোগ বাড়ায়। কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন নিজেই স্বীকার করেছেন যে, কারাগারের সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি বিদ্যমান এবং পরিস্থিতি উন্নয়নের চেষ্টা চলছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, দেশের ১৭টি কারাগার অনেক পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ, যেগুলোর দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। এছাড়া, বন্দিদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই বিচারাধীন মামলায় আটক রয়েছেন, যাদের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হলে হয়তো তারা মাত্র কয়েক মাস কারাগারে থাকতেন। এই দীর্ঘসূত্রতাও বন্দিদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এবং কারাগারের পরিবেশকে আরও জটিল করে তোলে। পুরনো কারাবিধি, যা মূলত ভারতীয়দের দমন-পীড়নের জন্য প্রণীত হয়েছিল, আজও বাংলাদেশে কার্যকর থাকায় কারা কর্মকর্তা ও বন্দিদের মধ্যে প্রভু-দাস সুলভ মনোভাব বিদ্যমান। এর ফলে বন্দিদের শারীরিক নির্যাতন, অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ, দাস সুলভ বেগার খাটুনি এবং মানবিক আবেদন অগ্রাহ্য করার মতো ঘটনা ঘটে।

তবে, এই অন্ধকার চিত্রের মধ্যেও আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কারা অধিদপ্তর বাংলাদেশের কারা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সংশোধনমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার জন্য একটি বড় সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে 'বাংলাদেশ জেল' এর নাম পরিবর্তন করে 'বাংলাদেশ কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস' রাখা, নতুন আইন প্রণয়ন এবং এক হাজার পাঁচশ নতুন পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে। বন্দিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, উন্নত খাদ্য (দৈনিক ১৮০ গ্রাম প্রোটিন সরবরাহের প্রস্তাব), নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ সুবিধা (ডে-কেয়ার, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, হাইজিন কর্নার), এবং গুরুত্বপূর্ণ কারাগারগুলোতে মোবাইল জ্যামার স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া, বন্দি ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ সরাসরি গ্রহণ ও সমাধানের জন্য একটি কল সেন্টার বা হটলাইন চালুর পৃথক প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হয়েছে। কারা মহাপরিদর্শক জানিয়েছেন, দুর্নীতি-অনিয়মে জড়িত অভিযোগে চারজন কারা কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এবং বন্দীদের সাথে মানবিক আচরণ নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নাম পরিবর্তন নয়, বরং দ্রুত বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত জনবল, উন্নত চিকিৎসা এবং কার্যকর পুনর্বাসনই এই সংস্কারের প্রকৃত সফলতা নির্ধারণ করবে।

সুপারিশ: বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থায় বিদ্যমান দুর্নীতি ও অনিয়ম নির্মূল এবং এর আধুনিকীকরণের জন্য অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, কারা আইন ও বিধিমালাকে আধুনিকীকরণ করে মানবাধিকারের প্রতি সংবেদনশীল এবং সংশোধনমূলক পদ্ধতির ওপর জোর দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, কারা কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দুর্নীতির অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, কারাগারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিচারাধীন বন্দিদের বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিচার বিভাগের সাথে সমন্বয় সাধন করা উচিত। চতুর্থত, প্রস্তাবিত সংস্কার পরিকল্পনাগুলো, যেমন – নাম পরিবর্তন, জনবল বৃদ্ধি, উন্নত খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ সুবিধা – দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, বন্দিদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি কার্যকর ও সহজলভ্য হটলাইন বা অভিযোগ কেন্দ্র স্থাপন এবং এর মাধ্যমে প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। পরিশেষে, কারাগারকে প্রকৃত অর্থেই 'সংশোধনাগার' হিসেবে গড়ে তুলতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য।


🔎 অনুসন্ধানে: নাফিসা রহমান

নাফিসা রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: কারাগার ও প্রিজন ম্যানেজমেন্ট।

Nessun commento trovato


News Card Generator