ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি

ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ

সাজিদ মাহমুদ  avatar   
সাজিদ মাহমুদ
ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩-এ যা ঘটছে: তথ্য-উপাত্তের কঠোর বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগ কর্তৃক ‘জাতীয় ব্লকচেইন কৌশল’ প্রণয়ন এবং এর অধীনে বেশ কয়েকটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (ICT) বিভাগ কর্তৃক ‘জাতীয় ব্লকচেইন কৌশল’ প্রণয়ন এবং এর অধীনে বেশ কয়েকটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ ব্লকচেইন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ওয়েব৩ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, ভূমি ব্যবস্থাপনা, সাপ্লাই চেইন ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্র ব্যবস্থাপনায় ব্লকচেইনের প্রয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের এই প্রচেষ্টা দেশের ডিজিটাল রূপান্তরে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই কৌশলগত পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয় যে, সরকার একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে এই উদীয়মান প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আগ্রহী, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্লকচেইন ও ওয়েব৩ ইকোসিস্টেমের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

ব্লকচেইন প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত বিকেন্দ্রীকরণ এবং অপরিবর্তনীয়তার বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন খাতে এর প্রয়োগের পথ উন্মুক্ত করছে। বাংলাদেশে, a2i (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রোগ্রাম এবং BASIS (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) যৌথভাবে ব্লকচেইন ডেভেলপারদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের পরিচালিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলো থেকে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ পেশাজীবী এই প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠছেন, যা দেশের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী ব্লকচেইন জনবল তৈরি করছে। তবে, ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে দেশের নীতিগত অবস্থান এখনও অস্পষ্ট এবং এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়ায় বিনিয়োগকারী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এটি একদিকে যেমন উদ্ভাবনী উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করছে, তেমনি অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক বাজার তৈরি করে আর্থিক ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

ওয়েব৩, যা ব্লকচেইন প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে নির্মিত ইন্টারনেটের পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে বিবেচিত, বিকেন্দ্রীভূত অ্যাপ্লিকেশন (dApps), নন-ফাঞ্জিবল টোকেন (NFTs) এবং মেটাভার্সের মতো ধারণার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ডেটার উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। BHTPA (বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ) তাদের বিভিন্ন হাই-টেক পার্কে ওয়েব৩ স্টার্টআপ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহ দিচ্ছে, যা এই খাতের বিকাশে সহায়ক। যদিও BTRC (বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন) সরাসরি ক্রিপ্টো বা ওয়েব৩ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে না, তবে ডিজিটাল কানেক্টিভিটি এবং ইন্টারনেট অবকাঠামো ওয়েব৩ এর বিস্তারের জন্য অত্যাবশ্যক। BTRC-এর নীতিমালা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ওয়েব৩ অ্যাপ্লিকেশনগুলোর ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে। বর্তমানে, বৈশ্বিক ওয়েব৩ বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব নগণ্য হলেও, স্থানীয় ডেভলপার ও স্টার্টআপদের মধ্যে এই প্রযুক্তি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।

ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩ খাতের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে, এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য আরও সুনির্দিষ্ট নীতি ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষত, ক্রিপ্টোকারেন্সির জন্য একটি স্পষ্ট রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা জরুরি, যা অবৈধ কার্যকলাপ দমন করে বৈধ বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি টেকসই ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশ এই উদীয়মান প্রযুক্তির বৈশ্বিক বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে পারবে।

প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সর্বশেষ তথ্য/লক্ষ্যমাত্রা সাল/সময়কাল
ICT Division জাতীয় ব্লকচেইন কৌশল প্রণয়ন প্রস্তাবনা গৃহীত ও বাস্তবায়ন শুরু ২০২১-২০২৪
a2i ব্লকচেইন ও ওয়েব৩ দক্ষতায় প্রশিক্ষিত জনবল প্রায় ৫,০০০+ পেশাজীবী ২০২২-২০২৩
BASIS ব্লকচেইন ও ওয়েব৩ সেবাদাতা সদস্য প্রতিষ্ঠান ৫০+ সক্রিয় প্রতিষ্ঠান ২০২৪
BHTPA হাই-টেক পার্কে ব্লকচেইন/ওয়েব৩ স্টার্টআপ ইনকিউবেশন সুবিধা ৫টি পার্কে ডেডিকেটেড ইনকিউবেশন ২০২৩-২০২৫
BTRC ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রায় ১৩.৫০ কোটি ২০২৪ (মার্চ)

উৎস: সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন, প্রকাশিত তথ্য ও সরকারি ঘোষণা।

সুপারিশ

  • ICT Division-এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এবং BTRC-এর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করে ডিজিটাল অ্যাসেট ও ক্রিপ্টোকারেন্সির জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন করা। এই ফ্রেমওয়ার্ক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
  • a2i এবং BASIS-এর যৌথ উদ্যোগে ব্লকচেইন, স্মার্ট কন্ট্রাক্ট ডেভেলপমেন্ট ও ওয়েব৩ আর্কিটেকচার বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিধি বৃদ্ধি করা এবং BHTPA-এর হাই-টেক পার্কগুলোতে ওয়েব৩ স্টার্টআপের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) ল্যাব স্থাপন ও এগুলোর জন্য বিশেষায়িত তহবিল বরাদ্দ করা, যা দক্ষ জনবল তৈরি ও উদ্ভাবনী প্রকল্পকে উৎসাহিত করবে।
  • ICT Division-এর 'জাতীয় ব্লকচেইন কৌশল' অনুযায়ী ভূমি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট পাইলট প্রকল্পগুলোতে ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে এবং বেসরকারি খাতের জন্য রোল মডেল তৈরি হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাজিদ মাহমুদ

সাজিদ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্লকচেইন, ক্রিপ্টো ও ওয়েব৩। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator