ডিজিটাল যুগেও ভূমি খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: নাগরিক ভোগান্তি চরমে | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল যুগেও ভূমি খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: নাগরিক ভোগান্তি চরমে

সাজিদুল ইসলাম  avatar   
সাজিদুল ইসলাম
ডিজিটাল যুগেও ভূমি খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: নাগরিক ভোগান্তি চরমে
ডিজিটাল যুগেও ভূমি খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: নাগরিক ভোগান্তি চরমে
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা দীর্ঘকাল ধরেই দুর্নীতি ও অনিয়মের এক জটিল জালে আবদ্ধ। ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি (মিউটেশন) এবং জরিপ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাত সাধ...

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা দীর্ঘকাল ধরেই দুর্নীতি ও অনিয়মের এক জটিল জালে আবদ্ধ। ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি (মিউটেশন) এবং জরিপ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাত সাধারণ মানুষের জন্য প্রতিনিয়ত ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার ডিজিটাল ভূমি সেবা চালু করে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা করলেও মাঠপর্যায়ে ঘুষ, হয়রানি ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এখনো অপ্রতিরোধ্য। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কর্তৃক প্রকাশিত 'সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫' অনুযায়ী, ভূমি সেবা খাত দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলোর মধ্যে একটি, যেখানে ৪৭.৬ শতাংশ খানা ঘুষের শিকার হয়েছে। এই চিত্র স্পষ্ট করে যে, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সত্ত্বেও ভূমি প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ।

ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও নামজারি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এখন একটি ওপেন সিক্রেট। বিভিন্ন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিসে দলিল প্রতি মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ, জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে রাজস্ব ফাঁকি, এবং অবৈধভাবে বিভিন্ন ফি আদায়ের অভিযোগ নিয়মিত। সম্প্রতি ঢাকা জেলার রেজিস্ট্রেশন প্রশাসনে জমির শ্রেণি পরিবর্তন, দলিল সম্পাদনে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, যেখানে গুলশান ও মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং জেলা রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ এনে স্থানীয় দলিল লেখকরা প্রতিকার চেয়েছেন, যেখানে মনগড়া অজুহাতে দলিল আটকে রেখে সেবাগ্রহীতাদের চরম হয়রানি করা হচ্ছে। একই চিত্র দেখা যায় সাভারের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে, যেখানে সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, রায়পুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের অফিসগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যেখানে নামজারি, খাজনা আদায় বা নাম সংশোধনের জন্য ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। দালালচক্রের মাধ্যমে ঘুষ আদায় এবং ফাইল আটকে রেখে হয়রানি ভূমি অফিসের একটি সাধারণ চিত্র। নবাবগঞ্জের ভূমি অফিসে ঘুষের হাট বসার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে হাইকোর্ট দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ভূমি মন্ত্রণালয় দুর্নীতির লাগাম টানতে এবং জনগণের ভোগান্তি কমাতে বিভিন্ন ডিজিটাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভূমি তথ্যব্যাংক এবং অনলাইন ভূমি কর ব্যবস্থা উদ্বোধন করেছেন, যার লক্ষ্য জমি নিয়ে জালিয়াতি ও দুর্নীতি বন্ধ করা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (সম্ভবত একটি পুরোনো বা ভুল তথ্য, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) মে ২০২৬-এ ভূমিসেবা মেলা উদ্বোধনকালে জানিয়েছেন যে, ভূমিসেবা দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করতে সরকার ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। ই-নামজারি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ভূমি উন্নয়ন কর অনলাইনে পরিশোধের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যাতে নগদ টাকা লেনদেনের সুযোগ কমে আসে। ভূমি মন্ত্রণালয় মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে ভূমি-সংক্রান্ত দুর্নীতি 'ওয়ান ডিজিটে' (১০ শতাংশের নিচে) নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এছাড়াও, স্বয়ংক্রিয় নামজারি প্রক্রিয়া চালু করা হচ্ছে, যেখানে দলিল রেজিস্ট্রির সঙ্গেই নামজারি সম্পন্ন হবে, যা ইতোমধ্যে ৩০টিরও বেশি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। ভূমি সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ আগস্ট ২০২৬-এ বলেছেন যে, সরকার ভূমি ব্যবস্থাকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং সনাতন পদ্ধতির বদলে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় সেবা ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে।

তবে ডিজিটাল পদ্ধতির বাস্তবায়ন সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে দুর্নীতির চিত্র খুব বেশি বদলায়নি। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামুন্দি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বহিরাগত ব্যক্তিকে দিয়ে ঘুষ আদায়ের অভিযোগে তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও কার্যকর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। কুষ্টিয়ায় ডিজিটাল সার্ভে (বিডিএস) কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে জমির মালিকদের জরিপের সময় সীমানা নির্ধারণ বা যন্ত্রপাতির ব্যবহার সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না, যা ভবিষ্যতে নতুন বিরোধ ও মামলা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। ভূমি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর খাতগুলোর একটি ভূমি প্রশাসন। এই খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেমন বাড়বে, তেমনি ভূমি নিয়ে সামাজিক সংঘাত ও মামলাও বাড়তে থাকবে। ভূমি মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালে অন্তত ২৫ জন সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, যার মধ্যে ১৫ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও চার্জশিট রয়েছে। ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এপ্রিল ২০২৬-এ বলেছেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে হবে এবং কোনো ধরনের দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।

ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও জরিপ খাতে চলমান দুর্নীতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। এটি শুধু সাধারণ মানুষের আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে সমাজে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে দুর্নীতি কমানোর সরকারি প্রচেষ্টা প্রশংসনীয় হলেও, এর সুফল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ অপরিহার্য। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান জিনাত আরা জমির শ্রেণি প্রতারণামূলকভাবে পরিবর্তন করে কর ফাঁকি দিলে শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাব করেছেন, যা রাজস্ব ফাঁকি রোধে সহায়ক হতে পারে। ভূমি অপরাধ আইনের খসড়া তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে, যা ভূমি-সংক্রান্ত অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সুপারিশ: ভূমি খাতে দুর্নীতি নির্মূলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে: ১. ডিজিটাল ভূমি সেবার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং এই প্রক্রিয়াকে আরও জনবান্ধব করতে হবে, যাতে দালালচক্র কোনোভাবেই এর সুযোগ নিতে না পারে। ২. সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিসগুলোতে নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শন ও নজরদারি বাড়াতে হবে এবং দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ৩. ভূমি জরিপ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, জমির মালিকদের জরিপ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে এবং ডিজিটাল ম্যাপ তৈরিতে আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ৪. ভূমি-সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর জন্য ১৬১২২ হটলাইন নম্বরটিকে আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করতে হবে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। ৫. ভূমি অপরাধ আইন দ্রুত পাশ করে এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভূমি জালিয়াতি ও প্রতারণার বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ৬. ভূমি অফিসের দালালচক্র উচ্ছেদে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: সাজিদুল ইসলাম

সাজিদুল ইসলাম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: ভূমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি ও জরিপ দুর্নীতি।

Комментариев нет


News Card Generator