রাজধানীর উত্তরা এলাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি অপব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি তৈরির ভয় দেখিয়ে এক তরুণীকে ব্ল্যাকমেইল ও শ্লীলতাহানির চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। অভিযুক্ত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য শোয়াইব মিজানের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন কুমিল্লার বাসিন্দা ভুক্তভোগী নাদিয়া আক্তার মিম। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন উত্তরার ডায়াবাড়ী পুরান কালিয়া এলাকার বাসিন্দা মিজান ও সালমা দম্পতির বখাটে পুত্র শোয়াইবের সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সূত্রে ওই তরুণীর পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে বিভিন্ন লোভনীয় প্রলোভন ও ফাঁদে ফেলে তরুণীকে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করে অভিযুক্ত শোয়াইব। সম্পর্কের একপর্যায়ে তরুণী বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করলে শোয়াইব ও তার পরিবারের সদস্যরা তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় এবং অত্যন্ত জঘন্য কায়দায় জানায় যে, এআই প্রযুক্তির সাহায্যে ভুক্তভোগীর ছবি ও ভিডিও দিয়ে পর্নোগ্রাফি তৈরি করে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এই চরম সাইবার অপরাধ ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ভুক্তভোগী তরুণী আইনি আশ্রয়ের পথ বেছে নেন এবং উত্তরা থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত শোয়াইব একা নয়, বরং এলাকার একটি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত থেকে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে স্কুল ও কলেজের মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, ইভটিজিং, মাদক সেবন, চুরি এবং ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে তার নাম একাধিকবার স্থানীয়ভাবে সালিশে উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায় বা পারিবারিক উদাসীনতার কারণে সে প্রতিবারই পার পেয়ে যায়, যা পরবর্তীতে তাকে আরও বড় অপরাধ করতে উৎসাহিত করেছে। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে যেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ভুয়া পর্নোগ্রাফি বা ডিপফেক ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, এই ঘটনা তারই একটি নির্মম ও বিপজ্জনক বাস্তব রূপ। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এবং পরবর্তীতে সামাজিক অসম্মানের ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ রাখার এই অপকৌশল শুধু ওই তরুণীর ব্যক্তিগত জীবনকেই বিপন্ন করেনি, বরং পুরো নারী সমাজের নিরাপত্তাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধরনের কিশোর গ্যাং সদস্যরা দিনের পর দিন আইনের ফাঁকফোকর গলে পার পেয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নরকতুল্য হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে উত্তরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ভুক্তভোগী তরুণীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমলে নিয়েছে এবং এ ব্যাপারে আইনগত প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। সাইবার ক্রাইন ইউনিট ও স্থানীয় থানা পুলিশের যৌথ তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত শোয়াইব এবং তার সহযোগীদের প্রযুক্তিগত অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। একই সাথে অভিযুক্তের পরিবার বা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি এই অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে শোয়াইব ও তার সহযোগীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু সাময়িক সালিশ বা নামমাত্র পদক্ষেপে এই ধরনের কিশোর অপরাধ দমন সম্ভব নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা মূল হোতা ও সহযোগীদের শেকড় থেকে উৎপাটন করতে হবে।
এই ধরণের জঘন্য অপরাধ আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তোলে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অশনিসংকেত। উত্তরা এলাকার মতো জনবহুল স্থানে কিশোর গ্যাংয়ের এমন বেপরোয়া আচরণ ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে এ ধরণের অপরাধ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা তরুণ সমাজের নৈতিকতাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই এই ঘটনার একটি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার সম্পন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কোনো নারীর জীবন নিয়ে খেলার সাহস না পায়।