মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

রকিবুল ইসলাম  avatar   
রকিবুল ইসলাম
মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত 'ডিজিটাল যুগে কপিরাইট সুরক্ষা ও রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা' শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে দেশের প্রথিতযশা সংগীতশি...

সম্প্রতি, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক আয়োজিত 'ডিজিটাল যুগে কপিরাইট সুরক্ষা ও রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা' শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে দেশের প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সুরকাররা সম্মিলিতভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে তাদের ন্যায্য রয়্যালটি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাহীন অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই সেমিনারে উঠে আসে যে, আন্তর্জাতিক মানের স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও স্থানীয় ডিজিটাল সেবাদাতারা যখন বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করছে, তখন মৌলিক সৃষ্টিকর্মের মূল ধারকরা, অর্থাৎ শিল্পীরা, তাদের প্রাপ্য রয়্যালটির ক্ষুদ্র একটি ভগ্নাংশও পাচ্ছেন না, যা তাদের সৃজনশীলতা ও জীবিকার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল মিউজিক ইকোসিস্টেমে এই অর্থনৈতিক বৈষম্য কেবল শিল্পীদের হতাশাই বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের সাংস্কৃতিক শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিচ্ছে।

মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে রয়্যালটি রাইটস বা স্বত্বাধিকারের বিষয়টি একটি জটিল অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিশেষ করে ডিজিটাল বিপ্লবের পর, বিশ্বজুড়ে সংগীতের ব্যবহার ও বিতরণ পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশে, যেখানে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে, সেখানে ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল ফোন অপারেটরদের ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস (VAS) এবং ইউটিউবের মতো ভিডিও প্ল্যাটফর্মগুলো সংগীতের প্রধান বিতরণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। তবে, এই প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে রয়্যালটি সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি এতটাই অস্বচ্ছ ও জটিল যে, অধিকাংশ শিল্পীই তাদের সৃষ্টিকর্মের প্রকৃত বাণিজ্যিক মূল্য সম্পর্কে অবগত নন, এমনকি তারা তাদের প্রাপ্য অর্থও বুঝে নিতে পারেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থা এবং একটি কার্যকর ও সমন্বিত রয়্যালটি কালেকশন সিস্টেমের অভাব এই সমস্যাকে আরও প্রকট করেছে। অনেক সময় দেখা যায়, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো যে পরিমাণ অর্থ স্থানীয় পরিবেশকদের দেয়, তার অতি সামান্য অংশই শেষ পর্যন্ত শিল্পীদের হাতে পৌঁছায়, যার ফলে শিল্পীরা তাদের শ্রম ও মেধা বিনিয়োগের সঠিক প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই অব্যবস্থাপনা নতুন প্রতিভাদের বিকাশেও বাধা সৃষ্টি করছে, কারণ আর্থিক অনিশ্চয়তা তাদের এই পেশায় দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে নিরুৎসাহিত করছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রয়্যালটি সংগ্রহ ও বিতরণের জন্য শক্তিশালী কালেকটিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন (CMO) বা সমষ্টিগত ব্যবস্থাপনা সংস্থা রয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতির অধীনে স্বাধীনভাবে কাজ করে এবং শিল্পীদের পক্ষে রয়্যালটি আদায় ও বিতরণ নিশ্চিত করে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানের অভাব প্রকট। যদিও বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস কপিরাইট নিবন্ধন ও কিছু আইনি কাঠামো প্রদান করে, তবে সক্রিয়ভাবে রয়্যালটি সংগ্রহ ও বিতরণের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা এখনো সীমিত। World Bank এবং ADB-এর মতো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো বিভিন্ন দেশে সৃজনশীল অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং মেধা সম্পত্তি অধিকার সংরক্ষণে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, এই খাতকে শক্তিশালী করতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক সহায়তার সম্ভাবনা অন্বেষণ করা অপরিহার্য। বিশেষ করে, ডিজিটাল যুগে মেধা সম্পত্তির সুরক্ষা ও রয়্যালটি বিতরণে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা গেলে শিল্পের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। এটি কেবল শিল্পীদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করবে না, বরং দেশের সৃজনশীল অর্থনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে এবং সাংস্কৃতিক পণ্য রপ্তানির সুযোগও তৈরি করবে।

বর্তমান কপিরাইট আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০২২) ডিজিটাল রয়্যালটি বিতরণের জটিলতা সম্পূর্ণরূপে মোকাবিলা করতে যথেষ্ট নয়। আইনের কিছু ধারা এখনো সনাতন মাধ্যমের রয়্যালটি ব্যবস্থাপনার উপর বেশি জোর দেয়, যেখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সূক্ষ্ম ও দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রকৃতিকে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, মাইক্রো-লাইসেন্সিং, অ্যালগরিদম-ভিত্তিক ব্যবহার ট্র্যাকিং, এবং ব্লকচেইন-ভিত্তিক রয়্যালটি বিতরণ ব্যবস্থার মতো আধুনিক ধারণাগুলো আইনগতভাবে সুসংজ্ঞায়িত ও বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এর ফলে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো প্রায়শই অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে শিল্পীদের কাছ থেকে অধিকার কিনে নেয়, যেখানে তাদের সৃষ্টিকর্মের দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক মূল্য উপেক্ষা করা হয়। এই আইনি দুর্বলতা শিল্পীদের দর কষাকষির ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেয় এবং তাদের অধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়ায়। একটি শক্তিশালী ও আধুনিক আইনগত কাঠামো ছাড়া, বাংলাদেশের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারবে না এবং শিল্পীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেই থাকবেন। এটি সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার একটি টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের পথে বড় বাধা।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩ (আনুমানিক)
মোট ডিজিটাল মিউজিক স্ট্রিমিং আয় (বিলিয়ন টাকা) ১.৫ ২.৩ ৩.৫ ৪.৮
শিল্পী ও গীতিকারদের প্রাপ্ত রয়্যালটির গড় শতাংশ (মোট আয় থেকে) ৫-৮% ৬-১০% ৭-১১% ৮-১২%
কপিরাইট নিবন্ধিত নতুন সংগীতকর্মের সংখ্যা (বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস) ১৫০০ ১৮০০ ২২০০ ২৭০০
স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে প্রতি স্ট্রিমে গড় রয়্যালটি বিতরণ (টাকা) ০.০৫-০.১০ ০.০৬-০.১২ ০.০৭-০.১৩ ০.০৮-০.১৪

উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, শিল্প সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিবেদন, এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ কপিরাইট আইন ২০০০-এর একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রয়্যালটি অধ্যায় সংযোজন করা, যা বিশেষত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য একটি স্বচ্ছ রয়্যালটি ট্র্যাকিং ও বিতরণ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে এর তদারকির দায়িত্ব দেবে। এই অধ্যায়ে মাইক্রো-লাইসেন্সিং ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা উচিত।
  • একটি স্বাধীন 'জাতীয় সংগীত রয়্যালটি বোর্ড' প্রতিষ্ঠা করা, যা বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করবে। এই বোর্ড World Bank-এর সহায়তায় একটি আধুনিক ডিজিটাল রয়্যালটি ট্র্যাকিং সিস্টেম গড়ে তুলবে এবং আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলন অনুসরণ করে রয়্যালটি সংগ্রহ ও বিতরণের মানদণ্ড স্থাপন করবে।
  • ADB-এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় শিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও প্রযোজকদের জন্য কপিরাইট ও রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা। এর পাশাপাশি, একটি ব্যাপক জনসচেতনতা কর্মসূচি হাতে নেওয়া, যা ডিজিটাল যুগে মেধা সম্পত্তি অধিকারের গুরুত্ব এবং এর বাণিজ্যিক মূল্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রকিবুল ইসলাম

রকিবুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator